জহির মৃধা

নিরা কামারের বাড়ি থেকে হাতুড়ির শব্দ আসে না আর। টুং টাং টুং টাং শব্দে মাতাল সকাল থেকে সন্ধ্যা, রাত্রিরও কিছুটা সময়। দা-বটি-খন্তি-শাবল-কাচি আরও কত নিত্য কাজের যন্ত্রগুলো লোহার শরীর থেকে বের হয়ে আসতো নিরা কামারের নিখুঁত হাতের ছন্দে মাতাল হাতুড়ির ছোঁয়ায় ছোঁয়ায়।
এখন সে হাতুড়ি বন্ধ, থেমেছে আওয়াজ।
নিরা কামারের শেষ কৃত্য, তাই কত কাজ।
ব্যস্ত সবাই।
কিন্তু তারও আগে কথা আছে। নিরা কামার থেমে যাওয়ার আগেই থেমে গেছে হাতুড়ি। কেন? কী সে কারণ? লোকেরা ফিস ফিস করে। কিছু বলে কিছু থাকে গোপন। নিরা স্তব্ধ গোমট। আজ হাতুড়ি চলবে না। হাপর ফুঁসবে না, জ্বলবে না লোহা গলানো আগুন। আজ মন তার লোহার চেয়েও শক্ত হয়েছে। চোখ দুটো আগুনে লেলিহান। যে চোখে কোমল স্বপ্ন ছিলো, সুদৃঢ় দৃষ্টি ছিলো।
নিরঞ্জনের বাবা মারা গেছেন তাই মা, বউ আর দুই ছেলে নিয়ে সাজানো সংসার। বাবার ভিটার আবার ব্যবসায় দিনরাত পরিশ্রম করে সে। কোনো ক্লান্তি নেই। ছেলেরা স্কুলে যায়। পাড়া-প্রতিবেশিরা আসে যায়। দু-দণ্ড বসে বিড়ি খায়। কেউ কেউ হাপরের দড়ি ধরে টানে। কেউ বা হাতুড়ি চালায়। কালো অঙ্গারের ভিতর দিয়ে আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলে। যেন আগুন নয়, হাপরের পেট ভরা বাতাসের তীব্রতায় লোহা গরম হয়। হাতুড়ির আঘাত পড়তেই লোহা নতুন রূপ নেয়। তৈরি হয় নানা ধরনের অস্ত্র। মানুষ আসে মানুষ যায়। নিরঞ্জনের ফুরসত নেই। এই ব্যস্ততায় মা ডেকে উঠে, নিরঞ্জন! নাস্তা খাইতে আয়। মগে জল দেওয়া, হাতমুখ ধো!
নিরা হাতমুখ ধুয়ে খেতে যায়। কোলে বসে তার বড় ছেলেটি। ছোটটি মার কোলে বসে চেয়ে থাকে, যেন সেও বাবার কোলে যাবে। নিরা হাত বাড়িয়ে ছোট ছেলেকেও কোলে নেয়। দুই ছেলে দুই কোলে কী আনন্দ তার। নাস্তা খাওয়ার কথা ভুলে যায় সে। বউ সামনে এটা সেটা এগিয়ে দেয়। তার মা খাবারের প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলেন, খা এবার। বাইওে থেকেও যাক আসে, ও নিরঞ্জন, নিরা।
কাস্টমারের ডাক শুনে নিরার চমক ভাঙে। ছেলেদেও কোল থেকে নামায়। গো-গ্রাসে খাবার শুরু করে। বউ আরও একটা রুটি এগিয়ে দেয়। না, আর না। কাস্টমার দোকানে।
আবার হাতুড়ির আওয়াজ টুং টাং টুং টাং। কী দারুণ ছন্দ! এ ছন্দ নিরার জীবনের ছন্দ। আনন্দপূর্ণ ঘরের ভেতর থেকেও এরকম ছন্দই বাজে।
আমিন কাহা বও। তোমার দাওডা রেতাইয়া দিই। আমিন কাকা বসে।
নিরঞ্জনের দোকানে কোনো জাতপাত নাই। হিন্দু-মুসলমান সবাই আসে, সবাই বসে। বিড়ি খায়। তবে নিরা বিড়ি খায় না, হুক্কা খায়। হুক্কার গুড়গুড় আওয়াজ যেন নিরার প্রাণে আনন্দ জোগায়।
কিরে নিরঞ্জন মলগুলি রাস্তায় পড়ে আছে, হাঁটতে অসুবিধা হয়। যেতে যেতে মাস্টার বলে।
মাস্টার বাই, সরাইয়া দিমু। হুক্কা রাখতে রাখতে উত্তর দেয় নিরঞ্জন। পুড়ে যাওয়া লোহা আঙ্গারের মতো টুকরো টুকরো হয়। পাথরের চেয়েও শক্ত এদেরকে মল বলে। নিরঞ্জনের বাড়ির চারপাশে এই মলে ভরা। এগুলোই প্রমাণ করে সেই কোন কাল থেকে তারা এই পেশা নিয়েছে।
বিড়ি শেষ করে কাদির হাপরে টান দেয়। অশুনি আঙ্গারের উপর পানি ছিটিয়ে চিমটা দিয়ে টকটকে লাল লোহা টেনে বের করে। লোহার পিড়ির উপরে রাখে। আর নিরঞ্জন বড় হাতুরি দিয়ে প্রয়োজন মতো বাড়ি মারতে থাকে। অল্পক্ষণের মধ্যেই একটা নিড়ি কাচির আকৃতি তৈরী হয়ে যায়। নিরা হাতের দা, কাচি, শাবলের অনেক সুনাম। তাই দূর-দূরান্ত থেকে কাস্টমার আসে।
কর্মকারের কর্ম ব্যস্ততায় দিন আসে দিন যায়। হিন্দু-মুসলমানের বিড়ি ফুকায় কোনো ভুল হয় না। কোনো কাজে ব্যত্যয় ঘটে না। নিরার বউ পূজা-অর্চনা করে। কাদির কিংবা আমিনরা নামাজ-রোজায় বিরক্তি হয় না। ধর্মে যার যার কর্মে সবাই সবার। হয়তো নিরার বাবার কালেও তাই হয়েছে নিরার ছেলে বেলায়ও তাই হবে।
নিরার ছেলে দুটো এখন স্কুলে পড়ে। অত্যন্ত সুদর্শন ছেলে হয়েছে তার। এই তো আর কিছু দিন। বড় ছেলে বাবার পেশায় হাত দেবে। বাবা বসে বসে ছেলেকে দেখিয়ে দেবে। কেমন করে কোন জিনিসটি কীভাবে বানাতে হয়। ছেলে এখনই বুঝে গেছে কতটা গরম হলে লোহা নরম হয়। বড় ছেলে উজ্জ্বল স্কুলে যাবার পথে বাবার কাছ থেকে পাঁচ টাকা নিয়ে যায়, টিফিন খরচ। ছোট ছেলে প্রাইমারিতে পড়ে। তার নাম সজল।
সন্ধ্যাকালে উধুধ্বনি আর শঙ্খের আওয়াজ হাতুড়ি থামিয়ে দেয় কিছুক্ষণ। নিরার সাথে যারা আড্ডা দেয় কিংবা কাজে সগযোগিতা করে। তারা কেউ কেউ নামাজে যায়। নিরা ঘরের দরোজায় জল ছিটায়। নিরার মা ধুপদানি দিয়ে যায়। ধুপের গন্ধে মৌ মৌ করে ঘর। প্রকৃতি যেন নতুন গন্ধে মাতোয়ারা। পাশের বাঁশবনে উজ্জ্বল জোনাকী জ্বলে। অসংখ্য জোনাকী অন্ধকার বনকে যেন বাসর বানিয়ে দিয়েছে। দূরে শিয়ালের ডাক। নিরা কামারের হাতুড়িতে আবার টুংটাং টুংটাং। মিথ্যা নয়, এ সময় বড় মায়াময়। রাত যায় দিন যায় স্বপ্ন পরীরা পাখা মেলায়। আরও সুন্দর আগামী আরও সুন্দরের দিকেই অবাক তাকায়।
কিন্তু কী জানি কী এক বিস্ময়। নিরঞ্জন স্তব্ধ হয়। আজ হাতুড়িতে আওয়াজ নেই। হাপুরে বাতাস নেই। অশুনি আসে আসে কাদির, তারা বিড়ি টানে। নিরা চুপচাপ। আজ কাজ হবে। কাদির জানতে চায়, অশুনি জানে না কিছুই। ঘরের ভেতর নিরা বউয়ের কান্না। মা থেকে থেকে বউকে ছেলেকে নাতিকে গালাগালি করছে। অশুনি ভেতওে যায়, খবর আনে নিরার বড় ছেলে বাড়ি নেই।
বাড়ি নাই তো হইলো কী? আউজ নাই কাইল আইবো।
কাদিরের কথায় অশুনি সায় দেয় না। হেয় জাত খোয়াইছে কাদির ভাই।
কী কও অশুনি দা! জাত খোয়াইছে!
হ, বউ কানতাছে। ঠাম্মা কইলো উজ্জ্বল মুসলমান অইছে।
এবার কাদির আরও চমকায়। বিশ্বাসের ডানা ভাঙে তার। কও কী অশুনি দা, সইত্য হুনছ নি? উজ্জ্বল মুসলমান অইছে। এই অল্পদিনের পোলা, কেমনে করলো এই কাম। মা-বাপ ছাইড়া অনে হেয় কই আছে?
মুসলমান কাদির, তার ধর্মে একজন লোক বেড়েছে। কিন্তু খুশি হয় না। নিরঞ্জনের মতো তারও মন ভাঙে। কোন ধর্মে কী আছে কাদির জানে না। জানে একসাথে বিড়ি খাওয়া, হাপর টানা, হাতুড়ি চালানো। সেই কতকাল থেকে তারা এক সাথে নিবিড় হয়ে আছে। কই কেউ তো কারও ধর্ম নিয়ে কথা বলেনি। কারও কোন ক্ষতিও হয়নি তাতে। বরং আজ ক্ষতি হলো। নিরঞ্জনের মন খারাপ, তাই মন খারাপ অশুনির, তার চেয়ে বেশি মন খারাপ আবদুল কাদিরের।
নিরঞ্জনকে কাদির কোনো সান্ত¦না দিতে পারে না। চুপচাপ ফিরে আসে, অশুনিও চলে যায়। একে একে নিরার আত্মীয়স্বজন আসে। খবর নেয়, আফসোস করে, চোখের জল ফেলে কেউ। কিন্তু নিরঞ্জনের চোখে জল নেই, বুকে ব্যাথা নেই। শান্ত নিশ্চল সে। উজ্জ্বল আলোয় যে স্বপ্ন বুনেছিলো একদিন, আজ উজ্জ্বলই তা ভেঙে চুরমার করে দিয়ে গেলো।
তারপর নিরঞ্জন ছোট ছেলের বউকে সংসারের এটা-সেটা বোঝায়। যেন কত শান্তি তার মনে। কোনো দুঃখ নাই। বেদনা নাই। কোথাও কিচ্ছু ঘটেনি। উজ্জ্বল নামে তার কোনো ছেলে ছিলো না কোনোদিন। কেউ এসে তার ঘর আলো করেনি। কাউকে দেখে সে কোনো স্বপ্ন দেখেনি। আলোর আনন্দে কাউকে বুকে জড়ায়নি। কোনো নরম তুলতুলে স্পর্শ তাকে উতলা করেনি। নিরা লোহার মতো শক্ত, আগুনের মতো শক্তি তার।
নিরা বয়সে নুব্জ্য কিন্তু ছেলে তো তার ছেলে। তাই ছেলের মাথায় হাত বুলায়। নিরার ছেলে বেলার গল্প বলে। কিন্তু নিরা তো তার ছেলে বেলাকে নয়, তার ছেলের ছেলে বেলাকে ভালোবাসতো। তার উজ্জ্বল, উজ্জ্বলের নরম তুলতুলে হাত, পা, তার পরশ এখনও সে অনুভব করে। কিন্তু সেই স্পর্শ তো লোহার মতো ছিলো না। কীভাবে লোহা হয়ে গেলো? কেন হলো?
স্তব্ধ নিরঞ্জন। অবাক চোখে দেখে চারপাশ। আর ভুল করে এই তো উজ্জ্বল এসেছে। চারপাশ আরো উজ্জ্বল করে।
কিন্তু উজ্জ্বল আসে না। নিরঞ্জনের চোখের পাতা আর উজ্জ্বল আলোয় ভাসে না। স্থীর হয়ে যায়। তাই স্থীর হয়ে যাওয়া মানুষকে নিয়ে কর্মচঞ্চল, মানুষের শেষ কর্ম চাঞ্চল্য।