শূন্য দশকের কবিতা

ফজলুল হক তুহিন

শকুন

টেকনাফ উপকূলে ঝাউবনে শকুনের দল খোশ গল্পে মশগুল

 নোনা বাতাসের ডানা নিয়ে এসেছে সুঘ্রাণ

দূর বহুদূর থেকে ভেসে আসে মৃত্যুগন্ধ

ওই যে আকাশে উড়ে উড়ে চক্কর মারছে সাগর ঈগল

আর কয়েকটা দিন শুধু অপেক্ষার কাল গোণা

তারপর নীর ঢেউ পার হয়ে পৌঁছে যাবে

সাগরে নৌকায় ভাসমান মানুষের মৃতদেহে

একসাথে অনেক লাশের স্তূপে হবে নিরিবিলি ভোজ।

কোথাও মানুষ নেই

কে শুনবে ওদের বাঁচার চিৎকার আকুতি?

আন্দামান থেকে বঙ্গোপসাগর ক’লে মানুষ এখন ব্যস্ত

মুদ্রার পেছনে

দাসের বাণিজ্যে

অস্ত্রের দখলে

নারীর নেশায়

হিংসার ভ’গোলে

কে কোথায় মরে ঝরে গেলো তাতে কিবা যায় আসে

ডানা ঝাপটায় শকুনেরা আসন্ন মাংসের উৎসবে আনন্দ-উাল্লাসে।

এই বুঝি ঢেউয়ে ঢেউয়ে মিশে যায় মুমূর্ষু উদ্বাস্তু প্রাণ

ঝাঁক বেঁধে শুরু হয়ে যাবে ক্ষুধাতুর শকুনের অভিযান।

রিঙকু  অনিমিখ

নিঃসঙ্গতা

গভীর রাতে কোন কোন বাড়ির দরজা খুলে যায়

শুয়ে শুয়ে শুনতে পাই আমি

মনে হয়- কে যেন বাইরে বেরোবে

অথচ দরজা মানে শুধু বাইরে বেরিয়ে যাওয়া নয়

বাইরে থেকে ভেতরে ঢোকাও

এই গভীর রাতে কে কাকে ঢুকতে দেবে ঘরে!

নাকি বেরিয়েই যাবে কেউ

এই অন্ধকারের ঢেউ- পেরিয়ে

চলে যাবে দূরে- ব্যথার সমুদ্দুরে…

ভালোবাসা বিষয়ক মন্ত্রণালয়

ধরো, দুঃখ বিষয়ক মন্ত্রণালয় হলো

ভালোবেসে দুঃখ পাওয়া মানুষের

পুনর্বাসন প্রকল্পে পাস হলো বাজেট

মনোরঞ্জনের জন্য গঠিত হলো কমিটি

তারা শারীরীক পুলক বিষয়েও ব্যবস্থা নিলো এমনকি

স্মৃতিযন্ত্রণা নিরসনে স্থাপন করা হলো পানশালা

এরপর একে একে তৈরি হলো অনুভূতি, প্রেম

সুখ ও ভালোবাসা বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ধরো

আরো অনেককিছু হলো, অনেকরকম ব্যবস্থা কিন্তু

আমি জানি, ওরা কোনভাবেই ভুল করেও

তোমার কথা বলবে না কেউ-

যতই উঠুক ঝড়, যতই উঠুক ঢেউ

জামিল জাহাঙ্গীর

দূরের দূরত্ব

দূর থেকে কেমন দেখায়

পাশে থেকে কখনো জানবো না

তাই দূরে গিয়েই দেখতে চাই দূরত্বর মাপ

যদিও হৃদয়ের কোন দূরত্ব নেই

সাইবেরিয়ার পাখিদের বাসা বাঁধতে নেই

পরিযায়ী পাখায় উড়ান বিস্তৃত আকাশবাড়ি

খাঁচা নয় বাঁচা চাই জল স্থল অন্তরীক্ষে

ইচ্ছের চেয়ে বড় জীবনের নেই প্রয়োজন

আর যদি ফিরে না আসি

তোমাদের হলুদবাড়ির নিকানো উঠোনে

শালিকের দল এলে জেনে নিও আমার খবর

জমিনের সঙ্গে আকাশের অদ্ভুত বোঝাপড়া…

যে দিন কোন পাখি দেখবে না

তারাদের জ্বলজ্বল করতে দেখবে নিশ্চয়ই

ভেবে নিও তাই হয়ে ঝুলে আছি

তোমাদের নক্ষত্রবাড়িতে অফুরান আলো

দূর থেকে কেমন দেখায় আমায়

তুমিও দেখে নিও তড়িঘড়ি

ভাবনাগাড়ির ব্যাকগিয়ার থাকে না

দূরে সুরে ডুব দেবার অনেক বিশুদ্ধ রঙ থাকে

হৃদয়ের কোন দূরত্ব নেই

পাখিদের বলতে শুনেছি

ওসব শোনা কথায় বিশ্বাস নেই

দূরে এসেই দেখছি দুরত্তের মানে…

জব্বার আল নাঈম

লাটিম

প্রবাহিত স্রোতের গতর ভেসে নৌকা ভেড়ে

কখনও মেঘের কখনও সূর্যের কাছাকাছি

আকাশে ওড়ে

নাটাইবিহীন ঘুড়ি

আমি- আজন্ম অস্থির লাটিম।

ক্লান্তিহীন কলমের সুখ-দুঃখ গল্প

স্যূট-বুটে মিশে জীবন আস্তর

থেমে থেমে নৌকা নদীতে…

ফুটবলে সবাই সমান তালে লাথি মারে

কোন দিকে যাব?

তাড়া খাওয়া মাছ জীবনের আনুকূল্য খুঁজি।

সাজ্জাদ সাইফ

মায়ের হাতের চুড়ি

(হোসাইন মাইকেল, কবিভাজনেষু) *

মায়া এক ফুল, যে কোনো গল্পের ভিতর দিয়ে

আমরা যতবার আফিমের কথা বলি, ততবার

 ফুলের ভ্রমর সঙ্গিহীন, উড়ে উড়ে বৃত্ত রচনা করে-

কুমড়ার মাচা বেঁধে, খুঁটির বাঁধনে মাটি ঢালছে কেউ;

আমাকে সুরের ভিতর হতে শিসগুলো আলাদা আলাদা

 গ্লাসে রাখতে বলে পত্রমিতালির মেয়েরা উধাও হলো!

অসুখের বিছানায় আর ক’টা দিন মায়ের হাতের চুড়ি

ধ্বনিযোগ করে যাক।

সুব্রত আপন

অগ্নিসম জ্বালা

ক্লান্ত দেহে নুয়ে পড়েছে শরীর, কিন্তু ভাড়াটে সুখের আশায়

সমুদ্রস্নানের পিপাসা অবিরত, গভীর গহ্বরে বন্দি দুয়ারে

কাম জ্বালিয়ে মুগ্ধ মায়ার অবসাদে ক্ষয় হয় আয়ু

ভুলে যাই যুগান্তরের চাপে নব উষ্ণতায় খসে পড়ে কৃষ্ণচূড়া।

বিস্ময়কর সমুদ্রস্নানে অতিপ্রিয়তায় ভুলে থাকা যায় সাম্রাজ্য

প্রেমশূন্য হৃদয়েও শান্তির অবসাদে জাগে কামবাসনা

নক্ষত্রলোকে শূন্যের পূর্ণতায় মনে রং লাগিয়ে

কৃত্রিম বসন্তের ছোঁয়ায় ফোটাই ফুল ফল।

আশ্চার্য! যেখানে জন্ম সেখানে আসক্তি, অগ্নিসম জ্বালায়

অদ্ভুত এক ইশারায় সমুদ্রের ঢেউয়ের ন্যায় গা ভিড়ায়

এঘাট-ওঘাটে নোঙর ফেলে অমৃত্বের স্বাদে।

রফিকুজ্জমান রণি

বিক্ষত আত্মার বিক্ষোভ

নক্ষত্র ফেলেছে পাহাড়ের কাঁধে জোয়াল

কার চোখ ভাসে বিরহী ঝরনার জলে

নিমগ্ন রাত : বৃক্ষের ভাঙা চোয়াল

কার্তিকের হাওয়া কোন দিকে হেঁটে চলে

তরুণী-শরীর পাহাড়ের চেয়ে উঁচু

ঘাতকের দল কেটেছে দেহের মাটি

উজানের কালে আচানক এই ভাটি

এলোমেলো ঝড় নিয়ে গেলো সবকিছু

পাহাড়ি ঢলে এতটা কি হয় ক্ষতি

যতটা নারীর সম্ভ্রমে যায় খোয়া

টানবে যে কে বর্বরতার যতি

শুদ্ধ দেহে নোংরা হাতের ছোঁয়া

নাগর হান্নান

 কুমিরের সাথে ভ্রমণে যাবো

কাঁচা বাজারের এক কোণে

ঝুলন্ত মাংসের দোকান দেখে বুঝতে পারি

মানুষ বড়ই ক্ষুধার্ত প্রাণী।

রঙ্গীন টেলিভিশনে

এযারকন্ডিশনের পাশে আমাদের মডেলদের সখ্যতা দেখে বুঝতে পারি

নিশ্চিন্তে তারা আমাদের ক্ষুধার্ত প্রাণিদের দারুণ সাপোর্ট করেন।

মনের অন্ধকারে ডোরাকাটা বাঘ দেখলে

বড়ো ভয় জাগে।

আগামী শীত সন্ধ্যায়

কুমিরের সাথে ভ্রমণে যাবো।

হিজল জোবায়ের

সিরাতুল মুস্তাকিম

ও গো সংগ্রাম, তুমি কার?

কেনো তুমি হেঁটে হেঁটে

আসো না কো দুয়ারে আমার!

এখন তো মাঝরাত, দুনিয়া আন্ধার

এই নাকি মিলনের শ্রেষ্ঠ সময়?

তবে কেন ভয়?

ওদিকে যেও না ওরা ডান

ওদিকে যেও না ওরা বাম

মাঝপথে আসো তুমি,

সরু আল ধরে আসো ছেড়ে দিয়ে গ্রাম

সিরাতুল মুস্তাকিমে ও গো শ্রেণী সংগ্রাম

ফেলে দাও কোল থেকে দুধের সন্তান

না দোহানো গরুর মতন গোঙাতে গোঙাতে আসো,

জমে থাকা দুধের ব্যথায় ফাটুক ওলান

শহরে প্লাবন হোক, বান হোক বান

বিপ্লব দীর্ঘায়ু হোক,

সাবধানে দু’পা ফেলে মৃতের শহরে আসো

শীতাতপ শবাধার আমার মোকাম

লাশ পেটে বসে আছে এ শহর, হিমঘর

শতাব্দীর ঝিকিমিকি স্যানাটোরিয়াম!

আমির হোসেন

সন্তাপ

তিতাসের নয়া জল-জল নয়তো সে

কূলে কূলে কিশোরীর উঁকিঝুঁকি লুব্ধুক

স্নিগ্ধ সে জলে এখন আর ভিজায় না পা

ছলিমের বউ

অতলান্তিক স্রোতের কেশে কেশে নয়া জলের

স্ফুটিত স্তনের লব্ধুুক ঢেউয়ে

মারেনা চোখ পাড়ার মাতাল যুবক

দু‘তীরের বেণীকরা গ্রামগুলি-গ্রাম নয়তো তারা

জলোবাতাসে ভেসে চলা সবুজের শৈলী

চুমকি হাসিতে জারুল-হুনালু ফুল

শিমুল-পলাশের ডালে গানের বুলবুল

জ্যৈষ্ঠের সাজে সাজুগুজু ফুলের শয্যা

হয়ে গেছে হরিদ্রাভ মহামারির দরিদ্র নিশান

ছাতিমের মাথা ছুঁয়ে উড়ে যায় বিষন্ন মেঘ

হলদে পাখির কন্ঠে করোনার করুণ সুর

কাঠগোলাপ, চাপা আর রক্তকরবীর

 ছোপ ছোপ লালে হৃদয়ের সন্তাপ

ঘাসের উপর নয়া জলে তিতাসের কূলে

ভেসে চলে বলাকা মেঘের সকরুণ ছায়া

য়ায় বুঝি বয়ে বৃন্দাবনের লীলাময় রাত

বয়ে যায় দিন প্রকৃতিবিহীন।

সৈম আকবর

দরজার ওপাশে এক ফালি চাঁদ

দরজা পেরিয়ে দেখি এক ফালি চাঁদ!

চাঁদের আলোয় কামিনীর স্বাদ

প্রতিদিনের বাজিধরা হারিকেনের চিমনি পরিষ্কার

ঝিঁ ঝিঁ পোকা ধরে পকেটে রাখা সবগুলো

ইতিহাস পেয়ে যাই দরজার ওপাশে!

তিন যুগ পেরিয়ে যখন দরজা খুঁজি

নিতান্তই কামিনী ফুলের স্বপ্ন।

হাসনা বুবাই তোমার কী মনে পড়ে?

কিচ্ছা শুনানোর রাত!!

আলাউদ্দিন আদর

সময়ের শিলালিপি

অগ্নেয়,পাললিক কিংবা রূপান্তরিত শিলা

কোনটিই নিরাপদ নই; সব ক্ষয়িষ্ণু

                                          যৌবনের মত

রক্তাক্ত বিদ্রোহ,সীমান্ত,পিলখানা:ইতিহাসের ক্ষত।

অথবা স্মৃতির সরু পথে দু’কদম হাঁটলে-

দেখা যায়

             আমাদের খুন মাখা ক্লাইভের খঞ্জর

বাংলার মাটিতে বেজন্মা শৈবাল; বিদেশি চর!

অতঃপর, ঐ চর;প্রতি খাতে চায় কর

দিয়ে স্বীয় মস্তক,স্বেচ্ছায় বন্ধক

ক্ষমতার গোলামী সে খাটে জীবনভর!

তারপর?

-তারপর,সার্কাসের মেয়েটি যেমন প্রভুর হাতের পুতুল

ঠিক তেমন।অদৃশ্য সুতোর টানে হয়

                                               নাটক মঞ্চায়ন

সময়ের শিলালিপির পাঠ; জানে কেবল প্রাজ্ঞজন!

রেদওয়ানুল হক

মিশে যাই রৌদ্রে

এসো সুঘ্রাণ নেই তরতাজা গোলাপের

এসো চেয়ে দেখি পাখিদের কারুময় ওড়া

এসো কান পেতে শুনি বাতাসের বিরহসঙ্গীত

এসো বুঝে নেই পিঁপড়ের রসালো আলাপ।

এসো ভাঁজ করে রাখি বুকের দুঃখ

এসো পরিপাটি করে তুলি সময়ের সুবাস

এসো হাঁটু গেড়ে বসে পড়ি সবুজ প্রার্থনায়

এসো খোলাসা করি কুয়াশাসকাল।

এসো অঙ্কিত হই প্রণয়ের লালরঙে

এসো লিপিবদ্ধ হই জমাট খাতায়

এসো হাসি দিয়ে ভরে তুলি অন্ধকার

এসো মুছে দেই কমনীয় কায়ার বিলাপ।

এসো ফু দিয়ে উড়িয়ে দেই তাবৎ জঞ্জাল

এসো বেদনা ছুঁয়ে মিশে যাই রৌদ্রে।

আহমেদ শিপলু

সাইকো সিরিজ-১৫

হারানো চাবির খোঁজ করতে করতে একদিন দেখলাম তালাটি আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

আজকাল তালার সাথে চাবিরাও পালিয়ে যেতে চাইছে ভীষণ আর আমি পড়ে আছি উন্মুক্ত চৌকাঠে।

ওইসব গোপন সাক্ষী চাবিগুলো আমার ঘুমের দরোজায় রেখে যায় সাপের পদচ্ছাপ।

হারানো তালা এবং চাবি খুঁজতে গিয়ে দেখলাম হারিয়ে ফেলেছি চৌকাঠ সমেত পাল্লা। চাবি আর তালা হাতে ঘুরলাম গাইলাম এ ডাল থেকে ও ডাল; এ ঢেউ, ও ক‚ল। নদীরা তালাহীন, কোনো গোপন নেই তাদের।

হারানো চৌকাঠের ঠিকানায় চিঠি লিখি, ছদ্মবেশে উঁকি দিয়ে বেড়াই এ ঘর, ও বাড়ি। হারানো মানচিত্রের দুঃখ। মানুষেরা চতুর পাখি শিকারি। হারানো ঘর, হারানো উঠোন, হারানো পুকুর, দিঘি।

আকাশ হারানো মানুষের কথা ভাবতে ভাবতে তালা চাবি আর দরোজা কাঁধে নিয়ে অনন্তঘুর্ণন…

বাড়িটা মানচিত্রহীন। চিঠিগুলো ফিরতিপথে।

এহসানুল ইয়াসিন

এই যে মেঘ

এই যে মেঘ, ঘোর অন্ধকার- কেবলি ডাকে আমি মুগ্ধ হয়ে প্রেমে পড়ি। বস্তুত মেঘও কৈশোরের প্রেমের মতো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ!

মেঘ দেখলে শরীর জাগে, অন্ধকারও তাই! কেন কেঁপে উঠো- খোঁজ অবলম্বন? জানো তো- জীবন এক মুহূর্তের নিঃশ্বাস ছাড়া আর কিছু নয়।

নত হও- ধ্যানমগ্ন প্রার্থনার চেয়েও গভীর আস্থায় হয়তো কিছু হবে কিংবা না। কী এমন আসে যায় জীবনও যাপন ছাড়া আর কিছু নয়।

এই যে দেখো- প্রতিরাতে আমরা ফুল ফোটানোর ইচ্ছে করি। ফোটে কী? কত গোপন ইচ্ছে অবৈধ ভ্রুণের মতো রক্ত হয়ে ঝরে কে রাখে কার খবর?

এসো যাপন করি- মেঘকে ভালোবেসে ডেকে আনি বৃষ্টি- এমন কি খানিকটা ঘোর অন্ধকার

পিয়াস মজিদ

দাউ দাউ ঢেউ

নাঙা একটা নূপুর ঢাকতে পারে তোমার পায়ের পাহাড়? এই প্রশ্ন মীমাংসা-রহিত জাগ্রত জগত তো মূলত এক নিদ্রানিকেতন। মানুষ ছেড়ে যায় তার পাশের এবং ভেতরের মানুষকে আর এই ক্রমে সংঘটন,কবিবন্ধন। শব্দের জল্লাদি শেষে তোমার স্নিগ্ধতায় ধুতে চায় ডাল, চাল আর আকাল। কাগজ আসে কর্পোরেশনের; আজকেই অবৈধ আত্মার উচ্ছেদ শরীরের ছটা তো তবিয়ত বহাল, তারায় যতই অন্ধকার যোনির জোনাকি জ্বলমান। বাগান ভরে ফোটা প্রেমিকাগুচ্ছ তাদের সমূহ সংবেদন থেকে অহোরাত্র ঘামছে যে ঘাট; সেখানে বাঁধা পাবে নীল নাও। জাহান্নাম, জহরত মুঠো ভরে তুলে নিয়ে দ্যাখো সে নৌযাত্রায় হেমন্তকে পাতালের সঙ্গী পাও কিনা! শীত পড়ছে মুষলধারে কতটা কনকনে কান্না আর কতটা কেচাপ; টমেটোর ফলনও আমাদের আদিপ্রশ্নের উত্তরে অক্ষম। তারপর তুমি কত কাছে গেলে! দূরের সুবাস কিনে নিলে; এডভান্স পেমেন্ট – অনিশ্চিত আগামীর রাগিণী জিন্দা তোমার গহীন গান থেকে ঝিরিঝিরি মিঠা লাশ ঝরে; নোনা নহর। অকালে মারা যাওয়া আমি পঞ্চভূতে না পরিবাগে?- জিজ্ঞাসার জবাব দেবে কে? হাওয়ার মাঠে তুলার তরু ঊষর বালিশ;শুয়ে শুয়ে প্রয়াত আমি শুধু ‘মিউ মিউ’ শুনি। তোমার বুকের বেড়াল; একমাত্র স্থায়ী রসাতল

সৈয়দ শিশির

মনে হয়

মনে হয়-

স্নেহভূমিতে আজকাল খুব সহজেই

হানা দেয় নরকের কীট,

হায়রে কীট! মায়া হয়। অকৃত্রিম মায়া।

কেন অকারণ হানা?

মনে হয়-

অবুঝ আর মৃতপ্রায় কীট

হাতিয়ে নিতে চায় স্বর্গভূমি,

অগ্রজের ছায়া করুণায় উল্লসিত। বেপরোয়া।

পারলে আয়নার সামনে দাঁড়া।

মনে হয়-

নর্দমার জলেই পবিত্র হবে কীট

তবে পদ্মের বুকে কাদা ছিটিয়ে,

করুণার হাত সরে গেলে অন্ধকার! গলিপথ।

কিছুটা সময় মাতলামি।

মনে হয়-

কীট হাসে, কীট উড়ে; কখনো-বা ঝিম ধরে।

ভূমিজুড়ে হাসি ঝরে; কীট তবু নড়েচড়ে।

হাসান ইমতি

আবহমান

চোখের দেশে উর্বসী রাজধানী তুমি,

অপেক্ষার পরগণায় সবুজ সংকেতের ঘাসজমি,

শীতের উপত্যকায় নৈকট্যের আদিম সালতামামি,

তুমি বিহনে সময়ের পাড়ায় বিরহ আমি।

চরের মত যখন তখন বেদখল হয় যদি মন,

যার তার জন্য যদি সাজে চুড়িদার হাতে কাঁকন,

ফেরার প্রতীক্ষায় যদি না বাঁচে চোখে কাঁপন,

হারের মত বুকে বাজে যদি জয়ের মাতন,

জ্বরের মত ওঠে নামে যদি সম্পর্কের পারদ,

রাতের কাপে কবিতা ঝড় থেমে যদি জ্বলে আগুন,

স্মৃতির পক্ষপাতে যদি পোড়ে বুকের বারুদ,

ভালোবাসার পুরনো সে হাতচিঠিতে

যদি যুগে যুগে ফেরার হয় মানব জনম,

ক্ষমতার মসনদে যদি ধরে খাকি পচন,

বেদনার রং যদি হয় জলপাইয়ের মতন,

জেনে রেখো উনুনের বিশুদ্ধ আঁচে

প্রতিদিন তবুও তোমাকেই প্রয়োজন,

গরম ভাতের ধোয়া ওঠা পেয়ালায় প্রতিদিন

তোমার সাথে বাঁচা মরার অন্য নাম জীবন।

নিলয় রফিক

আমার ঐতিহ্য

অলস দপ্তরে বসে,দখিনা বাতাস

সামনে আগুনশিখা কাঠের সেলাই

শৈল্পিক মননে আঁকা,বোটের শরীর

রৌদ্রেঘামে চকচকে অম্লান সুরত।

শব্দশ্রমিকের রক্তে উত্তরাধিকার

ডকে দেখি কারুকাজ,পিতার সৌরভ

সৃষ্টির আরাধনায় জোয়াইল্যা কাজে

বৈশাখে দুপুরে ছাদে কবিতার স্বর।

চিত্রকল্পে শিল্পজাদু অমিয় গ্রামীণ

নিভৃতে শেকড়েটানে পরিযায়ী ধ্যান

আদিশৈলী ইতিহাসে বোধের রহস্য

কাঠমেস্ত্রী কর্মচারু আমার ঐতিহ্য।

টীকা:

ডক=যেখানে নৌকা মেরামত করা হয়।

জোয়াইল্যা=রাজমেস্ত্রী বা কাঠমেস্ত্রী সহযোগি।

পলিয়ার ওয়াহিদ

অবিবাহিত চুমু 

ভেবেছিলাম—কোনো প্রেমিকা-ই বউ হোক আমার

কিন্তু তাদের সুহৃদ সিন্দুকের দোরে ঝুলানো অনাস্থার তালা

প্রেমের মসৃণ আঁচলে তোলা ঈর্ষার ফুল

তারা একেকজন পরশ্রীকাতরতার সুঁই

সবার মাঝে প্রবাহিত ঝড় এবং সর্বজনীন বিচ্ছেদের সুর

অথচ যাকে গ্রহণ করলাম—ভাদ্রের জোছনা চুবানো রাতে

প্রথম উপসনায় সে দাবি করলো—ভালোবাসার ফুল

দু’মুখের গড়াগড়িতে শেষ হলো—আমাদের আদরের মেকাপ

তার ঘনিষ্ঠ চিবুকের পাড়ে ঢুলে পড়লো শাহাদাৎ আঙুল

বলি তারে—আমি যে খয়েরি রঙের মৌমাছি এক

করি শুধু চিরদিন ফুলেরও কারবার

তবু সোনামুখী মেয়ে, আমার নেই কোনো ফুল।

প্রথম রাতে তোমাকে উপহার দিতে পারি পুরনো মধুর শিশি!

রাহমান মাজিদ

আতরওয়ালা

মুমূর্ষু পৃথিবী শুয়ে আছে বারান্দায়

সিথেনে উড়ছে ধুপ কাঠির ধোঁয়া

বিলাপের সুরে ও স্বরে উপচানো বুড়িগঙ্গা

গতকাল যে সাধু হাঁটু মুড়ে বসেছিল

তার উরুর মধ্যবর্তী ত্রিভুজের সামনে

তিনি আসবেন, শঠতার আস্তিনে শুদ্ধতার আতর মেখে

যাজক কিংবা পুরোহিত বেশে

স্বপ্ন বিছাবেন, শান্তি ছিটাবেন

অতঃপর বগলদাবা করবেন শান্তিমুকুট

হুজুর আপনি আসুন, বসুন মরার শিয়রে

বয়ান করুন গোরাযাবের রকমফের

কিংবা বউ তালাকের বিশদ বিবরণ

অতঃপর কাঁদুন খাটিয়ার পায়া ধরে

জুব্বা’র প্রান্ত টেনে মুছুন চোখের পানি ও নাকের শিন

আমরা আছি দু’হাত তুলে, আমিন আমিন আমিন।

জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশাহ

. স্থিরচিত্র

একদল সিগারেটের ধোঁয়ামিছিল; তুমি দিলে দৌড়—

আলোর বর্শিতে ছিড়ে গ্যালো বাতাশের গাল;

আমি আমাকে পুড়িয়ে নিলাম আগুনে— আর তুমি

ফুঁ দিলে উড়িয়ে দিলে বিকেলের জীবন ।

.

আদর্শ ঈগল যতটা ছিড়ে খায় মেঘ—

কিংবা মিঠাপুকুরে ডুবে মরে যত বৃদ্ধমাছ; দেখছি;

ভীষণ দেখছি; তুমি পুতুলচোখে বেশ রাখো খোঁজ—

আর আমি দিনভর কবিতাহীন— স্বভাবের চরমপত্র ;

দ্যাখো একবার; উড়ে যেতে আটকে গেছি তোমাতে।

হাসনাইন হীরা

লাইফ ইজ ট্রাভেল ওয়ার

…যা বলছি—তা আলাপ

যা বলছি না—তাও আলাপ

এমত একটা গল্পের ইনভেলাপ বয়ে বেড়াচ্ছি।

সত্য-মিথ্যা, জন্ম-মৃত্যু, ধার-দেনা

প্রেম ও ঘৃণার শাপশাপান্ত নিয়ে

অনুজ্জ্বল পৃথিবীটা ঘুরছে আমার মাথার ভেতর

বিন্দু থেকে বিস্মৃতি

প্রতিদিনকার সংবাদ প্রতিদিন

পড়ি, ছিঁড়ি আর উড়িয়ে দেই দূর্লভ হাওয়ায়

একটা আলাপের হাত থেকে

আরেকটা আলাপের হাতে গিয়ে গল্পটা

রেললাইনের মতো আরো বেশি দীর্ঘ হতে থাকে…।

রবিউল আলম নবী

স্বর্গের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই

মরে যাবে জেনেও মানুষ বেঁচে থাকতে চায়

বাঁচতে বাঁচতে একদিন ঠিক মরে যায়

যতদিন পাপ করা যায় পাপ করে নেয়া ভালো

পূণ্যে কিছু নেই সে-তুমি সকলেই জানে

তাই শৈশবে যতোটা সম্ভব শিশু থেকে

যৌবনে যুবক থেকে

আর বার্ধক্যে যেহেতু গুটিয়ে আসে হাত-পা

ক্ষয়ে আসে জ্যোতি

পাপ করে নেয়া প্রজ্ঞাবানের কাজ।

মরে যাবার পর একটা পৃথিবীসমান বাড়ি

ঝর্ণা/ষড়ঋতু/আঙুর/মদ/নারী

গাড়ি (নেই, কেননা হাইওয়ে রোড নেই কোনো)

কিছুই পাবে না জানে চার্বাকপুত্রগণ

তারা জানে

পাপেই আছে কনসার্ট-ভরা আনন্দ।

বেঁচে বেঁচে একরাশ জীবনের হাতে তুলে দিতে হয় সৌম্য উল্লাস

জীবনের ভেতর মৃত্যুকে ঢুকিয়ে দিতে গিয়ে সঙ্গমের মতো

তুলে আনা যায় কিছু আনন্দ

কিছু ছন্নছাড়া বোধ

আর নিজের ভেতর ডুবে যাবার মতো অতল জলধি সম্ভার।

মৃত্যুর পর মৃত্যু নেই কোনো

জীবনের পর জীবন নেই কোনো

জীবনের পর মৃত্যু আছে

জীবনের পর কিছু নেই আছে জেনে

যতদিন বাঁচা যায় পাপ করে নেয়া ভালো।

ফরিদ (প্রাইমারি স্কুলের বন্ধু) বলেছিল,

স্বর্গের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই

আমি নরকের লোভ সামলাতে পারছি না।