হোসেন আবদুল মান্নান


জন্মভিটার একেবারে নিকটে রেলস্টেশন থাকায় কানুমিয়ার গোটা জীবনই কাটে ট্রেন আসা যাওয়ার নিরন্তর শব্দ শুনে শুনে। দিনের যে সময়টুকু সে বাড়িতে পরিবারের সাথে কাটায় সেসময়ও ট্রেনের হুইসেল শুনতে পায়। এ শব্দ যেন আজন্ম তার হৃদয়ের গভীরে বাজে। দিনভর ট্রেন উত্তর-দক্ষিণ অর্থাৎ উভয় দিকে চলে। আশৈশব কানুমিয়া তাই দেখে আসছে। সে মন চাইলে দু’দিকেই যেতে পারে। কারণ ট্রেনে চড়ার জন্য তাকে কোন টিকিট করতে হয় না। শিশুবয়স থেকে মানিকখালী রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঘুরাফেরা করায় তাকে চিনে না এমন মানুষ কম। ঘর সংসারের কাজে কোনদিনই তার মন বসে না। ফলে পরিবারের দৈনন্দিন দায়-দায়িত্বও তার ওপর খুব একটা পড়ে না। তাই এলাকার সবাই ধরে নিয়েছে এভাবে গাড়ি চড়েই কানুমিয়ার জীবন কেটে যাবে।

বিশেষ কোন অঘটন না ঘটলে প্রত্যহ সকালে উঠে স্নানাহার সেরে আর দশটা পেশাদার মানুষের মতই সে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। যেন ভীষণ ব্যস্ত কাজপাগল একজন মানুষ। আসলে তা না। কানুমিয়া নিয়মিতই স্টেশনে আসে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে দু’দিকে তাকায়। তার প্রথম নজর পড়বে সিগন্যালের দিকে। এই মূহুর্তে কোন্ দিকের সিগন্যাল উঠানো তার কাছে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রেন যে দিক থেকেই আসুক গন্তব্যহীন যাত্রী কানুমিয়া ট্রেনে উঠে পড়বে। যেন আগে আসলে আগে পাবে এমন। আশেপাশের পরিচিত স্বজন বা সমবয়েসি কেউ যদি জিজ্ঞেস করে ভাই কই যাবা? উত্তর দিকে গেলে কানুমিয়ার জবাব হবে কিশোরগঞ্জ্ যাব। দক্ষিণ দিকের ট্রেনের কামড়ায় উঠলে জিজ্ঞেস করতেই সহজ উত্তর ভৈরব বাজার যাব। আরেকটু প্রলম্বিত আলোচনা হলে সে চমৎকারভাবে বুঝিয়ে দিবে তার গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক কাজের কথা। তার জন্য অন্তত পাঁচজন ব্যবসায়ী তথায় অপেক্ষা করছে। ব্যস্ততার কারণে সে তাদের সময়ই দিতে পারছে না।

বাস্তবে কানুমিয়া একজন আনমনা, সহজ-সরল, অশিক্ষিত তবে মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন পাড়া-গ্রামের মানুষ। কারও বিপদে-আপদে, আত্মীয়-স্বজনের দু:সংবাদ, সুসংবাদে দ্রুততম সময়ের মধ্যে হাজির হওয়া মানবের নাম কানুমিয়া। যে কেউ তাকে হাসি মুখে কথা বলে যে কোন স্থানে যে কোন কাজে নিয়ে যেতে পারে। কোথায় যাবে, কখন যাবে, কিসের জন্য যাবে এসব প্রশ্ন কানুমিয়া কাউকে কোনদিনই করেনি বা করতে জানে না। তার চরিত্র হলো সঙ্গদানকারী এক বিশ্বস্ত সহযাত্রীর মত। রবিঠাকুর যেমন বলেন, Ôবিনা কাজের সেবার মাঝে পাইনে আমি ছুটি,Õ কানুমিয়ার অবস্থাও তাই।

মধ্যবিত্ত একান্নবর্তী গ্রামীণ যৌথ পরিবারে তার জন্ম। সম্পূর্ণ কৃষি নির্ভর পূর্ব পুরুষের এক বাউন্ডেলে উত্তরাধিকারী চরিত্রের নাম কানুমিয়া। অন্যান্য সন্তানের মত মা-বাবা কানুমিয়াকেও স্কুলে পাঠানোর চেষ্টা করেছিল। যেমন, সব বাবা মা করে থাকেন। কিন্তু শিশুকাল থেকেই লেখাপড়ায় তার একেবারেই মন বসে নি। বই তার কাছে কতিপয় কাগজের মলাট বাঁধা বোঝা। তাকে এসব পরিপাটি বাঁধাই করা কাগজ কোন দিনই আকৃষ্ট করতে পারেনি। বাংলা মাধ্যমের স্কুল বা মাদ্রাসা, মক্তব, আরবি, ফারসি কোন কিছুকেই সে গুরুত্ব দেয় নি। ফলে শৈশব-কৈশর থেকেই সে সম্পূর্ণ আলাদা অন্য জগতের মানুষ। দিনমান রেলস্টেশন-হাট-বাজারে-উদ্দেশ্যহীন এলোমেলো ঘুরে বেড়ানোই তার নেশা, তার আনন্দ। এক পর্যায়ে পরিবার ধরেই নিল কানুমিয়াকে পথ হারানো পরিব্রাজকের এ পথ থেকে সরানোর চেষ্টা করা অরণ্যে রোধন ছাড়া আর কিছুই নয়। তাকে তার বোহেমিয়ান রাস্তা দেখানোই ভাল।

কানুমিয়ার বাবা সাতগেরামের মাতবর। ধণাঢ্য গেরস্থ মানুষ। অনেক সন্তান-সন্ততি তার। তিনি ভাবলেন কানুমিয়াকে কৃষি কাজে দিবেন। লেখাপড়া না করলেও তার মাঠ ভর্তি জমি দেখভাল করবে কানুমিয়া। কিন্তু না, সেটাও তাকে দিয়ে হলো না। তার চাই নিত্য বেরিয়ে পড়া। রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো যাত্রী, ট্রেনের গরগর শব্দ, ফেরিওয়ালার সুরেলা ডাক, কুলিদের চিৎকার, ঘণ্টাধ্বনি, টিকিট চেকার, গার্ডের হঠাৎ হুইসেল এ সবই তার কাছে অতি প্রিয়। তার ভাল লাগে কোলাহল, মানুষের অবিরাম পথ চলা, ঘরে ফেরার চঞ্চলতা, আকুলতা ইত্যাদি।

এবার কানুমিয়ার পরিবার মনস্থ করলো তাকে শীঘ্রই বিয়ে দিতে হবে। তার সংসার হবে, ঘর হবে, স্ত্রী থাকবে, সন্তান আসবে। তখন সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসবে। স্ত্রী’র শাসন থাকলে সর্বক্ষণ স্টেশন-ট্রেন কিছুই করতে পারবে না। সংসারে মন দিতে বাধ্য হবে। অন্তত কিছু না কিছু করে তবেই তাকে জীবিকা করতে হবে। যথারীতি বিয়ের দিনক্ষণ ধার্য হলো। পাত্রীও সকলের পছন্দের। সবাই জানে কানুমিয়ার লেখাপড়া নাই, কোন পেশা নাই, কর্মহীন এক যুবক। তথাপি পৈত্রিক অবস্থা ও নাম ডাক আছে বিধায় পাত্রীকে খুব কষ্ট করতে হবে না। সবাই তাকে চোখে চোখে রাখবে। তাছাড়া পাত্র হিসেবে কানুমিয়ার অন্য কোন অযোগ্যতা তো নেই। সদালাপী, সজ্জন, সামাজিক, পরোপকারী, সুদর্শন এসব কিছুই তার অনুকুলে। কাজেই বিয়েতে বাধা কোথায়? নির্দিষ্ট তারিখে বিয়ে হলো। সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো। ঘরে নতুন বউ আসলো। আত্নীয়-পরিজন আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি, গ্রামীণ রেওয়াজ, ঐতিহ্য সবই রক্ষা করে শুভ কাজের সমাপ্তি হলো।

প্রথম দু’চার দিন কানুমিয়া বেশ আন্তরিকতা প্রদর্শন করলো। যেন হঠাৎ বদলে যাওয়া মানুষ সে। সবাই বলাবলি করছে, দেখো সংসারই তাকে ঘরে ফেরাতে পেরেছে অন্য কিছু নয়। আর কখনো সে বাইরমুখী হবে না। বিনা কাজে এদিক ওদিক বেরিয়ে পড়বে না। এখন দায়িত্ব পড়েছে ভাল হয়ে যাবে। মা-বাবা পাড়া প্রতিবেশী দোয়া করছে যেন দ্রুত এদের সন্তান-সন্ততি হয়। কানুমিয়া যেন সুসন্তানের পিতা হয়ে একজন পরিশ্রমী বাবা হয়ে উঠে। এ আশায় কানুমিয়ার ধর্মপ্রাণ মা বাড়ির কাছের বড় আউলিয়ার মাজারে একটি ছাগল মানত করে রেখেছেন।

কিন্তু বিধিবাম, সপ্তাহ খানেক দমবন্ধ খাঁচার ভেতর আটকে ছিল কানুমিয়া। হঠাৎ একদিন ভোরে সবার অজান্তে বাড়ি ছেড়ে একরকম দৌঁড়ে মানিকখালী স্টেশনের দিকে চলে যায় সে। ভোরের ট্রেনের হাতল ধরে ঝুলে সোজা গৌরীপুর জংশনে এসে থামে। এ ক’দিন ট্রেনে চড়তে না পেরে কানুমিয়া হাঁপিয়ে উঠে। যেন সদ্য জেল ছাড়া কয়েদি। গৌরীপুর স্টেশনে নেমে বেশ ফুরফুরে মেজাজে পড়ন্ত বিকেলটা মনের আনন্দে কাটায় সে। অগণিত মানুষ দেখছে। ট্রেনের ক্রসিং, শান্টিং, ছাদে মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা, বাদাম বিক্রেতা, কলা, ছানাচুর, জুতাকালি, সর্বরোগের ঔষুধ বিক্রেতা ক্যানভাসার, ট্রেনের কামড়ায় ভিড় ঠেলে জোড়া অন্ধ ভিক্ষুকের সুরেলা গান, ট্রেন পুলিশের সাথে বন্ধুত্ব, চা খাওয়া আরও অনেক কিছু। যা কানুমিয়ার আশৈশব ভালবাসার সঙ্গী। এসব ছাড়া কী তার একটি দিন চলে? এভাবে তিন-চার ঘন্টা পার করে ফিরতি  ট্রেন ধরে গভীর রাতে সে বাড়ি আসে। এদিকে নববধুর উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ, বিচলিতবোধ কিছুই যেন তার নজরে আসেনি। স্ত্রীর নানা প্রশ্নের মুখে ধীর-স্থির স্বাভাবিক উত্তর দেয় কানুমিয়া-

একটি জরুরি কাজ ছিল

কী কাজ আপনার আমি জানতে চাই

একজনের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেছিলাম

তারে পাইছেন?

না পাইনি

দেখি, কাল আবার যাইতে হইবো

কাল কখন যাইবেন?

দেখি ভোরেই যাইব

না, কাল আপনি যাইবেন না ইত্যাদি ইত্যাদি……….

রাত পোহাল। আজ খুব সকালে জাগে নি কানুমিয়া। অনেক বেলা করে ঘুম ভাঙ্গে তার। যথারীতি গতকালের মত বের হওয়ার নীরব প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। হঠাৎ একটি ট্রেনের শব্দ তার কানে আসে। সাথে সাথে পরণের জামাটি হাতে নিয়েই বাড়ির পেছনের রাস্তাধরে স্টেশনমুখী হয় কানুমিয়া। স্ত্রী পেছন পেছন দৌঁড়ে চিৎকার করে বলতে থাকে, এই গাড়ি তো উত্তর দিকে যাচ্ছে না, যাচ্ছে দক্ষিণে। তবে কী আজ ভৈরবে যাইবেন? কানুমিয়া একবারই পেছন ফিরে হাত নাড়ায়। উচ্চস্বরে বললো, রাতেই ফিরা আইবো। কানুমিয়ার বংশেরই মেয়ে সদ্য বিবাহিত স্ত্রী মল্লিকা বানু ভীষণ কষ্ট পায়। আক্ষেপ করে বলে, সরকার যদি প্রত্যেকদিন গাড়িতে উডার লাগি সবাইকে ধইরা জরিবানা করতে পারতো, জেলে দিতে পারতো তা অইলে এই মানুষটা রাইত পোহাইলেই ইস্টিশনের দিকে দৌঁড়াইতো না। এই জন্যই মানুষে বলে, বাড়ির কাছে ইস্টিশন থাকা ভালা না।##

লেখক: কথাসাহিত্যিক, সচিব, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ঢাকা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *