কোয়ারান্টাইন, উদ্বেগের সাদা ঘোড়া

শাটডাউন শহরে ঘুরে উদ্বেগের সাদা ঘোড়া
যেন সে নাগরিক নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে পড়া
হারানো ব্যস্ততা তাড়া যান্ত্রিকতা সওয়ার হয়েছে তার পিঠে
যেন সমস্ত অস্থিরতা বিহ্বল আমাদের প্রত্যাশার চাবুকে!

এখন সে দখলে নিয়েছে এভিনিউর সুনসান নীরবতা
কোয়ারান্টাইন শহরের অদ্ভুত মান্যতা, তার ক্ষুরের আঘাতে
অবলীলায় মাড়িয়ে যায় রীতি প্রথা আইন
যেন বিস্ময়কর মুক্তির স্বাদ আজ তার অবমুক্ত বুকে!

চোখ তার জ্বল জ্বল করে কোন নির্জন ভৌতিক সুখে
যখন বস্তি ও ক্ষুধার্ত জনপদগুলো ফ্যাকাশে জোছনা পান করে
সে হেঁটে বেড়ায় সেসকল কর্পোরেট দুঃখ প্রান্তরে
আর শাটডাউন রোগীদের কফিনের ভিড়ে, কবরে!

দুর্যোগের শহরে ভুলগুলো সাপের মতন ফণা তোলে
আর জমানো পাপের ভাগাড়ে নগ্ন অনুতাপ নৃত্য করে
যখন মৃত্যু হানা দেয় ক‚ট কৌশলগুলো উলঙ্গ হয়ে যায়
তাদের বহন করে উদ্বেগের সাদা ঘোড়া!

আজ সে ক্ষুরের শব্দে মাড়িয়ে যায় অর্জিত অনুশোচনা
বুকের ভেতরে কাঁপন তোলে যেখানে জমেছিলো সময়ের দেনা!!

ট্র্যাজেডির শস্যক্ষেত্র

দুয়ারে দাঁড়ানো মৃত্যু সাদা-কালো
অথচ ভেতরে জ¦লে সন্মোহন আলো
প্রতিদিন সূর্যোদয় হয়ে নামে চেতনা প্রান্তরে

আশাকে তখন আরও সবুজ সবুজ লাগে
যখন তার গায়ে হাত বুলাই
স্পর্শ পেয়ে সে কেমন মুহূর্তেই নদী হয়ে যায়

আমি কি আবার তবে ভিজরো এই নদীর জলে?
সাতরে কি যাব আবার অই পাড়ে?
যেখানে সুখের পাখি একদিন বাসা বেঁধেছিল

আর আমাকে ডেকেছিল অবিকল স্বপ্নের মতন হাত তুলে।

যান্ত্রিকতার শিকল খুলে কোনদিন সেখানে যেতে পারিনি,
এই জীবন্ত নদীর জলে শুধু তার সুখদ গন্ধ শুঁকেছিলাম।

পাড় ভাঙা ঢেউয়ের গর্জনের সাথে কতদৃশ্য ভেসে গেল
বানের মারণ পানি খুঁটে খেল অস্তিত্বের পরম মৃত্তিকা
নির্লজ্জের মতন আবার ফিরে আসি অবসন্ন আশার প্রান্তরে

রক্তাক্ত শাবলে গড়ে তুলি শিল্পের দৃশ্যপট
ট্র্যাজেডির সকরুণ শস্যক্ষেত্রে
বিমুগ্ধ স্বপ্নের রঙ পাকা হয়ে ওঠার আগে-

আবার দুয়ারে মৃত্যু, রঙ তার সাদা-কালো!

দোয়েলের গান

যারা করে রাতের সুধা পান, তারা শুধু জানে
সুবহেসাদেক থেকে শুরু হয় দোয়েলের গান।

হে বনি ইনসান, সুখদ শিল্পের কারিগর
পৃথিবী ঘুমায় তবু কেন জেগে থাকে মন?

আলোর উদ্ভাসে ভাসে নয়নের দেহসত্তা
কী নিবিড় নিরবতা, কী সূ²তর হৃদয় সঙ্গীত!

অন্তরে বিছায়ে দেয় সবুজ গালিচা
শীত নিদ্রায় জেগে ওঠে ক্ষুধা

শোনো, আলোর অনুষঙ্গী সেই দোয়েলের গান
এখনই ভাসার কাল, এবং পৃথিবী জাগার আগেই

সেই ঐকতানের সাথে মিলাও আত্মাকে
যেখানে মিশে যায় উদ্ভাসী দোয়েলের শিস।

পরিযায়ী শব্দের বিভ্রম

রাত ও দিনের রূপ একাকার নৈশব্দের মাঝে
মানুষের বুকে সঘন হয়ে ওঠে কোয়ারান্টাইন
তখন হয়তো জোছনার নীরবতা গিলে খায় অদৃশ্য ভাইরাস

আদিম ভয়েরা যেনো ডানা ঝাপটায় স্বপ্নের বারান্দায়
দিশাহীন দারিদ্র্য মুখ থুবড়ে পড়ে গলির ভাগাড়ে
বুক থেকে হামাগুড়ি দিয়ে নামে দূরের আশঙ্কা

সারারাত পঙ্গপালের মতন ঝরে শব্দের বিভ্রম
দিনকে রাতের ফ্রেমে বন্দী করে অলৌকিক আইন
সাদা পিপিইর ভেতরে ঢেকে রাখে সময়ের চঞ্চলতা

কেমন একাকার হয়ে যায় থাকা ও না থাকা
একাকিত্বের তীরে বিদ্ধ নিসর্গ ও নির্জনতা
সহসাই মনে হয় চারপাশে পৃথিবীর সব রঙ সাদা

গার্মেন্টসের নারী শ্রমিকেরা অদ্ভুত ফ্যাকাশে ও সাদা
সময়কে বুকপকেটে রেখে সব যান্ত্রিকতা এখন সাদা
আমরা যাকে জীবন বলি সেও কেমন নিঃস্তব্ধ ও সাদা!!

দরোজা

নীরবতার ভিতর দিয়ে অনুভবের দশটি দরোজা
যার সাথে সংযুক্ত সিদরাতুল মুনতাহা
সীমাবব্দতার মরু সমুদ্র পর্বত পেরিয়ে
মানুষ পৌঁছতে চায় মোক্ষম প্রান্তরে।

তবু স্বরচিত রক্তপাত, নফসের বিবাদ ও রাজনীতি
মানুষকে জড়িয়ে রাখে নিজেরই সীমাবদ্ধতার জালে
কিন্তু তার শুভ ইচ্ছাটি থাকে এইসব জটিলতার উর্ধে
বিতাড়িত অমঙ্গল তাকে জড়িয়ে রাখে
কুটিল আবর্তে

তাই মানুষ ‘ইকরা বিসমে কাল্লাজি খালাক’ থেকে শেখে
এই শেখাই হচ্ছে তার সক্ষমতার ডানা
মানুষ শেখে লোক থেকে পরলোক অবধি
মানুষ শেখে সীমাবদ্ধতা থেকে
সীমাহীনের দরোজা অবধি

এতো রক্তপাতের নদী, স্বার্থের সংক্ষুব্দ সমুদ্র
রাজনীতির নামে ধুম্রজাল
প্রোপাগান্ডা
তার শুভ ইচ্ছাগুলোকে দমাতে পারে না

মানুষের অবমুক্ত ইচ্ছার সত্তাটি বলে
সে কোনদিন নিঃসঙ্গ না
তার সব থেকে কাছেই থাকেন নির্ভয় পরম সত্তা
আর তার অনুভবের উজ্জ্বল রাস্তাটি
তার ভেতর সত্তার মতোই খোলা।

বিনির্মাণ শিল্পের সপক্ষে
(মুশতাক খন্দকার ও ক্বণন শিল্পীদের)

কখনো এমন হয় চারপাশে শুদ্ধতম কোন ঢেউ নেই
নগরে আছড়ে পড়ে ব্যধিগ্রস্ত দীর্ঘশ্বাস
বাতাসে সিসার গন্ধ ঘুরে ফিরে অজানা উদ্বেগ
কর্পোরেট নগরীতে দিনের ভিতরে রাত হানা দেয়
একটা গোলক ধাঁধা দবদবে সাদাকেও করে দেয় ম্লান
কেমন নিস্প্রভ হয়ে যায় সব গৌরবের কৃতিত্ব সম্ভার

সবকিছু ঢেকে দিয়ে নামে যেন এক বালিয়ারি
উড়ায় শঙ্কার ধূলো, দীর্ঘ হয় নিঃসঙ্গতার ছায়া
ভূত আর ভবিষ্যত একাকার শুধু নেই বর্তমান!
এমন দুঃসহ দিনে মশালের মতো জ্বলে মানবিক মন
বুক থেকে সহসাই নেমে আসে ক্ষোভ
লোকে যাকে দ্রোহ বলে, বিনির্মাণ শিল্পের সপক্ষে
কবিতা কবিতা বলে আছড়ে পড়ে চেতনার উপকূলে!

লরা ভেগলিয়েরি স্মরণে

রোমের হলুদ বাতাস আর আসন্ন সন্ধ্যার চোখে তখন অশ্রæ
অনেকেই তাকে সভ্যতার কান্না বলে মেনে নিতে দ্বিধান্বিত
কিন্তু দুর্দশা পতন সচেতন আত্মার কাছে চিরকালই বিব্রতকর
তাই দুঃখিত লরা তার ঝিনুক খোলসে বিষাদের রঙ ঢেলে
গড়ে তুলেন এক অনিবার্য উত্থানের নীরব প্রাচীর

তখন নিয়ন আলোতে জ্বলে উঠেছিল অদৃশ্য উদ্বেগ
প্রাচীন এই নগরীর রাস্তায়
নৈশব্দের ইমারতে ধ্বসে পড়েছিল কামনার রাত
যেন মানুষের মনে অর্ন্তদাহনের মতো মৃত্যুর মহোৎসব
কোটি কোটি ভ্রæণ মৃত্যু আলোর নিউরণে ঝরে
হয়তো দেখেনা কেউ উপলব্দির সৈকতে ঢেউয়ের গর্জন
নির্জন খোলসে ঢেকে ধেয়ে আসে নৈতিক মৃত্যু
অব্যাহত কোলাহল সাইল্যান্সারে মহাপতনের আগাম গোঙানি
কে প্রশ্ন করবে, কে দেবে উত্তর? এমন অমীমাংসিত সন্ধিক্ষণে
সন্তপ্ত হৃদয়ে আশার আলোতে রক্ত ঢেলে
লেখেন তিনি অনিবার্য সাক্ষ্যদানের মতো
তার প্রতিটি অক্ষর অন্ধকারে জ্যোতির্ময় বাতি হয়ে জ্বলে!

পিপিইপরা শুক্লপক্ষের চাঁদ

মধ্যরাতে যেন সাদা পিপিই পরা শুক্লপক্ষের চাঁদ
থেমে যাওয়া অ্যাম্বুল্যান্সের মতন আচ্ছন্ন জোছনা
আর কী অদ্ভুত মাস্কপরা এই রাতের নীরবতা
লকডাউন শহরে ঘুরে উদ্বেগের সাদা ঘোড়া!

অচঞ্চল বাল্বের মতন ডাক্তার ও নার্সেরা
আটান্নটি আইসোলেশন বেডে সুদূরের নির্জনতা
ঝুলে আছে ভেন্টিলেটরের ফ্রেমে
সমাগত মৃত্যুর হাত ধরে!

আজ শহরের বুক ভরে আছে করোনা ক্লান্তি
মর্গের মতন শোক, পিপিইপরা পূর্ণিমার চাঁদ
আলোর প্রতিবিম্বে থোকা থোকা কোয়ারান্টাইন
শহরে ছড়িয়ে দেয় শোকাহত কবরের আইন!!

অপারগতা

প্রতিনিয়ত উদ্বেগের করোনা বাতাস বয়ে যায়
ছিন্নভিন্ন খর রৌদ্রের আয়নায় দেখি নিজেরই মুখ
নেকড়েদের খুবলে নেয়া খাদ্যের মতো
নাকি পলিথিন মোড়ানো রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরের মতো
নাকি সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরগুলোর মতো
নাকি গ্রিসের জঙ্গলে অনাশ্রিত অভিবাসীদের মতো
কিছুতেই আর বুঝতে পারি না
যেন একচক্ষু মিডিয়ার মতো চোখের অপারগতা
গাজা উপত্যকায় দীর্ঘস্থায়ী লকডাউন আর্তনাদ বুঝতে পারি না
যুদ্ধবাদের কুফলে চাপা পড়া পৃথিবীর উৎকণ্ঠা বুঝতে পারি না
কাশ্মিরের বোবা কান্না বাতাসকে ভারী করে আমাকে করে না!
যেখানে সযতেœ প্রতিপালিত হয় মানুষের প্রতি ঘৃণা
এমন রাজনীতির উর্বর শস্যক্ষেত্রে আজ আর আমাদের কারোরই অমত না!
বারুদের ব্যবহার বৃদ্ধির বিষয়ে সর্বসম্মত আমাদের নাগরিক চেতনা
একমাত্র ধ্বংসোপকরণকেই বলা হচ্ছে এই ভ‚গোলের পরম প্রতিরক্ষা
দুর্বৃত্তপনার নাম সভ্যতার কূটনীতি
গোলার্ধের বুকে কম্পন বাতাসের বুকে ভয়
সমুদ্রের সহ্যসীমা অতিক্রম করে উন্নয়ন দুর্বৃত্তপনা
উদ্বেগের পিপিইপড়া শহরগুলোতে
ছিন্নভিন্ন ঝরে পড়ে ক্ষুধার্ত রৌদ্রের ফেনা
হয়তো তা করোনা
হয়তো তা আমাদেরই সময়ের দেনা।

বাংলাদেশ

অবিস্মরণীয় তার প্রাকৃতিক শোভা
স্বপ্নের মতন থোকা থোকা জলোগন্ধময়
চারদিকে লতাপাতা গুল্ম ও উদ্ভিদ।

সবুজ ঐশ্বর্যে ঢাকা, কত শতাব্দী প্রাচীন
পরাহত আকাক্সক্ষায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়
আবহমান নদীগুলো ঢেউ তোলে-

রক্তের স্পন্দনে। হাজার কাহিনি তার
বিচিত্র কথার জাল জন্ম-জন্মান্তরে
অজস্র উত্থান হয়ে অবিরত জ¦লে।

বুক জুড়ে মরমিয়া স্বপ্নের আঙ্গিনা
অনাদির ছায়া ঢাকা পাখিপ্রীতি বৃক্ষসুখ
মানবিক রোদের বিন্যাসে।

This article has 2 comments

  1. বদরুজ্জামান আলমগীর Reply

    মহিবুর রহিমের আগেও ভালো লাগতো, আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *