শহিদুল ইসলাম অপু //

বাবার সাথে নাঈমের সম্পর্কটা তেমন ভালো না। ছোট থেকেই একটু একটু করে বাবার সাথে তার দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তাছাড়া নাঈম জীবনের তাগিদে পরিবার ছেড়ে দূরে একটা মফস্বলে থাকে। মাঝে মধ্যে ফোনে বাবার সাথে কুশলাদি বিনিময় হয় এই যা। নাঈম নিম্মমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান, তাই জীবনে সবসময় বিভিন্ন সমস্যা লেগেই থাকে। মফস্বলে সে ছোট্ট একটা চাকরি করে। এখনও বিয়ে করেনি। পরিবারে তার মা বাবা ছাড়া আর তেমন কেউ নেই। ছোট ছোট আনন্দ বেদনা নিয়েই নাঈমের জীবন মোটামুটি কাটতে থাকে। সারাদিন অফিসে, সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ অলস সময় পার করে তারপর খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পরে, পরদিন সকালে আবার অফিস। এভাবেই কেটে যায় তার সময়।

রাত আটটার দিকে হঠাৎ নাঈমের ফোনটা বেজে ওঠে। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে তার বাবার ফোন!
-হ্যালো!
– হ্যা বাবা!
-কাল কি আমাকে একটু সময় দিতে পারবে?
-এভাবে বলছো কেনো বাবা?
-না! তেমন কোন কিছু না, দিতে পারবে?
-কাল কখন?
– দুপুরের পরে?
– ঠিক আছে বাবা।
– ঠিক আছে আমি কাল দুপুরের পরে ফোন দিবো
-ঠিক আছে দিও।

ফোন টা বাবা রেখে দেয়। নাঈম মোটামুটি চিন্তায় পরে গেছে, ব্যাপার কি!  বাবাতো এভাবে কখনও বলে না।  আজ এমন ভাবে বললো কেনো!!  এসব ভাবতে ভাবতেই সে তার বাবাকে ফোন দেয়।
-হ্যালো বাবা, মাকে একটু ফোনটা দাও তো, কথা বলবো
-হ্যালো মা!
– বলো বাবা
নাঈমের মা সবসময়ই তাকে বাবা বলে ডাকে,(নাঈমের মাঝে নাকি তার মা সবসময় নিজের বাবাকে দেখতে পায়)
– মা তুমি একটু একা হও তো, বাবার কাছ থেকে একটু দূরে গিয়ে কথা বলো
– হ্যা বলো বাবা
– আচ্ছা মা, বাবা আমাকে এভাবে কালকে সময়ের কথা বললো কেনো? কিছু কি হয়েছে?
– কি জানি বাবা, আমাকে তেমন কিছুই বলে নাই। ইদানিং প্রায় সময়ই তোমার বাবা তোমার কথা চিন্তা করে, আর নিজের সাথেই যেন কী সব বলে, আমি বুঝতে পারি না।
– ঠিক আছে মা। তোমরা সবাই ভালো আছো তো?
– এই তো বাবা আছি ভালোই। তুমি আমাদের কথা চিন্তা করো না।

আর তেমন কোন কথা না বলেই ফোনটা রেখে দেয় নাঈম।

পরের দিন নাঈম অফিসে গিয়ে বসের সাথে কথা বলে ছুটি নিয়ে বাসায় চলে আসে। বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে বাবার ফোনের অপেক্ষা করতে থাকে। দুপুর আড়াইটার দিকে বাবার ফোন পেয়ে নাঈম বাসা থেকে বের হয়ে বাবার সাথে দেখা করতে মফস্বলের বাসস্ট্যান্ডে যায়।
-বাবা ভালো আছো?
– ভালো! তুমি কেমন আছো?
– হ্যা বাবা ভালো। আচ্ছা বাবা তুমি এমন হঠাৎ দেখা করতে বললে কেন?
-তোমাকে নিয়ে এক জায়গায় যাবো।
-কোথায়?
– আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমার মা মানে তোমার দাদি সেখানে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো। তা প্রায় পঞ্চান্ন কি ষাট বছর আগের কথা। বেশি দূরে না। এখান থেকে দশ বা পনেরো মাইল হবে। একটা কামেল পিরের দরগা আছে। সেখানে যাবো।
– তো বাবা হঠাৎ সেখানে আমাকে নিয়ে যেতে মন চাইলো কেনো?
– কিছুদিন যাবৎ আমার মনটা ভালো নেই, মনে হলো তোমাকে নিয়ে সেখানে একবার ঘুরে এলে আমার ভালো লাগবে।

আর তেমন কোন কথা হয়না তাদের দুজনের মাঝে। ওখানে পৌছার পর বাবা নাঈম কে জিজ্ঞাসা করলো তোমার কি ওযু আছে?
– না
– ঠিকাছে ওযু করে এসো
নাঈম ওযু করে আসে, তারা দুজনে একসাথে দরগায় ঢুকে। নাঈম শুধু চুপ করে দাড়িয়ে আছে। মনে মনে ভাবছে বাবা এখানে আমাকে নিয়ে আসলো কেন? তাছাড়া বাবাকে কেমন যেন ক্লান্ত দেখাচ্ছে। বাবা তার মতো করে বিভিন্ন সূরা-কেরাত পাঠ করছে। একপর্যায়ে বাবা দোয়ার জন্য হাত তুললো। নাঈমও সাথে হাত তুললো। বাবা দোয়া করছে!

-ইয়া মাবুদ, ইয়া মাওলা, তুমি তো অন্তর্যামী, তুমিতো আমার মনের কথা সবই জানো। ইয়া মাবুদ আমি অধম গোনাহগার বান্দা আমার একমাত্র সন্তান কে নিয়ে তোমার পেয়ারা লোকের দরগায় এসে তোমার কাছে হাত উঠাইলাম। তুমি আমার দোয়া কবুল করো। মাবুদ গো মনে কতো কথা আছে, প্রকাশ করতে পারি না। তুমি আমার মনের আশা পূরণ করো।
মাবুদ গো আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও তুমি আমার সন্তান কে ভালো রাখো, সুখে রাখো। তোমার কাছে আমার একটাই চাওয়া, তুমি আমার সন্তানকে ভালো রাখো। আমিন! ছুম্মা আমিন!

বাবা দোয়া শেষ করলো! নাঈম এখন হাত নামাতে পারছে না, মনে হচ্ছে সে পাথর হয়ে গেছে। তার ভেতরটা কেমন জানি ধুমরে মুচড়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। কখন যে তার চোখ থেকে নোনা জল গড়িয়ে পড়েছে সেটা সে টের পায় নি। বাবা দোয়া শেষ করেই দরগার বাহিরে চলে গিয়েছিলো। নাঈম দোয়া শেষ করে তার বাবা যেখানে দাড়িয়ে আছে সেখানে গেলো।

কেউ কোন কথা বলছে না, শুধু রাস্তা ধরে দুজন হাটছে ফেরার পথে। হঠাৎ নাঈম একটু দ্রুত হেটে তার বাবার সামনে গিয়ে দাড়ালো। বললো-
-বাবা! আমি তোমাকে একটু জরিয়ে ধরতে চাই!
বলেই ভালোভাবে সে বাবাকে জরিয়ে ধরলো। অঝরে পানি পরছে দুজনের চোখ থেকে।
-বাবা আমি তোমাকে অনেক সময় অনেক কষ্ট দিয়েছি, আমাকে তুমি মাফ করে দাও!
– পাগল ছেলে আমার! মনে মনে ভাবে বাবা।

দুজনের বুক থেকেই অনেক বছরের জমাট পাথরটা নিমেশেই ভেঙে গেলো। বাবার বুকে সন্তান,সন্তানের বুকে বাবা এ যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।##

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *