নূর কামরুন নাহার :
কবি ও কথাসাহিত্যিক । জন্ম ১০ মার্চ ১৯৭১। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় এম.এ। লেখালেখির শুরু স্কুল জীবন থেকে। মূলত কথাসাহিত্যই তার সাধনার বিষয় তবে কবিতাও লিখে থাকেন। গ্রন্থ সংখ্যা ষোলটি। লেখালেখির বিষয়- মানুষের বহুমাত্রিক জীবন ও সম্পর্ক, মানুষের বিচিত্র মনোস্তত্ত্ব¡, শ্রেণি সংগ্রাম। নেশা -লেখা, পেশা- চাকুরি, ভালোবাসেন মানুষ আর প্রকৃতি। বর্তমানে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার পদে কর্মরত

তোমার হাত ধরে আছি

মৃত্যূমাখা এ শহরে তোমার হাত ধরে আছি
জানি, অর্ন্তগত ক্ষরণ দেখে না নগরের কংক্রিট।
মৃত্তিকায় পড়ে না বনানীর ছায়া
প্রিয়ার ঠোটের বিশুদ্ধ চুমুতে লেগে থাকে কৃত্রিম রং।
জলাশয়ে মৃতমাছেরা ভেসে থাকে কাফন গায়ে।
আলোড়িত বৃক্ষের পাতায় ঝরে পড়ে
ফিলোমেনার বোবা আর্তনাদ।

তবু ঐ হাতে সর্মপিত এ হাত।
জানি, বেড়ে ওঠেছে নাগরিক বেওয়ারিস রাত।
পূর্ণিমার জোৎস্নায় ফোটো না সাদা চন্দ্রমলি¬কা।
চকচক করে জ্বলে কেউটের বিষাক্ত কিরীচ।
প্রতিশ্রæত প্রেমিকেরা পান করে লিথির জল।
ইকাসুরের ডানার মতো পুড়ে যায় স্বপ্নের শুদ্ধ শরীর ।
অবরুদ্ধ এ শহরে তোমার হাত ধরে আছি
উষ্ণতার ঘামে দুটো হাত হবে আজ লরেল পাতা ।

নিষিদ্ধ গন্ধম

চুম্বন করো না আমায়, আমি পর নারী
কাবিনে রয়েছি বাঁধা রজ্জু কঠিন বিশ্বাসের।
বলেছিলে তাই হবে, তুমি মানস নারী, সে মন্ত্রের।
তুমি প্রেম, তুমি বেদী, তুমি নারী ঈশ্বরী
তার সাথে গার্হস্থ্য জীবন, সে ঘরের।
আত্মায় তোমার বাস, প্রতি লোমকূপে
তুমি নিশ্বাস, উচ্চারিত আমার প্রতি কবিতা
পবিত্র শব্দের বিন্যাস।

ভালোবাসি বলো না আমায়, আমি সীতা
নবী আইয়ুবের বিবি রহীমা, রানী পেনিলোপী
এক পুরুষে রেখেছি মন,
তার বাহুতে বাঁধা ভালোবাসা যৌবন
সর্বগ্রাসী দখলের দেহে, রেখো না স্পর্শের ছাপ।
তবু অবাধ্য হলে তুমি। বললে, ভালোবাসি
সিঁদুর না নাও তুমি নিয়ে যাও খুন
সিঁথির উপর রেখেছি আমি আমার চুম্বন।
চরম নাস্তিক আমি, তবু ঈশ্বর বলছেন আমায়
আজ রাতে, দিয়েছি প্রেম, মহুয়ার বিষ,
অনন্ত জ্যোতি, হোমশিখা,
বলেছেন তিনি, তুমি সেই নারী
আত্মার অংশ তুমি, তুমি রাধা, পরমহংস
নির্বাণ তুমি, বিশ্বাসের কলেমা।

এইবার যদি নতজানু হই অলৌকিক নূরে
যদি স্পর্শ করি আগুন, যদি হয়ে উঠি ফিনিক্স পাখি
দেখ প্রতিবার প্রত্যাখানে ফিরি পরমাত্মায়
আর চুম্বন করি তোমার পবিত্র কদম
বল, কতবার অস্বীকার করবে তুমি
বল তবে,
প্রেম তোমার মহুয়া নাকি নিষিদ্ধ গন্ধম।

বৃক্ষের মতো দুঃখগুলো

প্রার্থনার কাছে ফিরে এসে বৃক্ষের মতো দুঃখগুলো দেখি
গন্ধময় বাতাসে ওরা ওড়ে মানুষের চোখের মতো
অশরীরী অভিসম্পাতে ওরা বৃক্ষ হয়, চোখ হয়
জন্মের দুখে জন্মান্ধ স্কাইলার্ক।
মোহের কাছে পরাজিত হয়ে শিখে নেয় জলের ভাষা
অথচ ওরা দম্ভ করেছিলো অনড় পাথর হবে বলে।

মাটি থেকে পাথরের জন্ম আর বৃক্ষ থেকে কয়লার।
কয়লা থেকে কাঁচকাটা হীরা।
বৃক্ষের শরীর ক্ষয়ে একদিন কয়লা হবে।
ক্লেরোফিলের সবুজ শুষে
অন্ধকার থেকে জ্বলে ওঠা আগুন।
কৌণিক আলোর বিচ্ছুরণ নিয়ে
পৃথিবীর শেষ কোহিনূর।

প্রার্থনার ঘরে জেগে থাকি একা।
অনন্ত অলৌকিক নীলাভ আঁধার
দেখি বৃক্ষ নয়, চোখ নয়, কোহিনূর নয়
ওরা শরীর আমার।

জলের শরীর

একদিন এক বন্ধু আমার পুকুর দেখালেন
শান্ত, নিটোল জলাশয়,অকম্প।
বললেন, দেবে ডুব।

মেঘনা পাড়ের মেয়ে আমি
আজীবন কেটেছি সাতার জলে, অতলে।
মহাকাব্যের মতো রচনা করেছি ঝর্ণার জন্মের ইতিহাস।
ব্রহ্মপুত্রের কাছে শুনেছি দুঃখের কীর্তন।
দেখেছি লক্ষ্যা কিভাবে হয়ে ওঠে কংক্রীটের কীট।
বুড়িগঙ্গা আহ্ দুঃখী মেয়ে নর্দমার কালো জল নিয়ে
বলে গেছে দানবের ধ্বংসলীলা, জৌলুশের কাল।
পৃথিবীর দীর্ঘতম নদ, নীল
নীলকণ্ঠ পাখি হয়ে অলিন্দে নিয়েছে দখল।
হৃদপণ্ড প্রতিদিন জলের বিস্তার।
এক পুকুরের জলে ভিজবে না শরীর আমার।

বিশ্বাসে ভ্রান্তিতে রেখেছি জল।
এখন পরমাত্মার খোঁজে প্রস্ততি, পূর্র্ণ আয়োজন।
নোনা জলে সন্তরণ করে করে হয়ে গেছি এক সমুদ্র
সুপেয় জল নেই, দুচোখে হৃদের লবণ।
কী পদ্মা, কী মেঘনা, পৃথিবীর কোন জলাশয়
কোন জলে আর ভিজবো এখন!

হাওয়াই মিঠাই

বস্তুত তারা কিছুই পায় না
যারা জীবনের প্রতিশব্দ লেখে অন্ধকার
আর দাসত্বের কাছে যারা সমর্পিত।

কেউ কেউ লুসিফার আর ঈশ্বর
এই দুই সত্তাকে অস্বীকার করে।
বলে- জীবন হচ্ছে একটা সিগারেট
যা জ্বলতে জ্বলতে ছাই এ নিঃশেষ হয়ে যায়।
অতঃপর আর কোনো অস্তিত্বই থাকে না।

কেউ কেউ পুনর্জন্মের কথা বলে
পুনরুত্থানে কারো বিশ্বাস
বস্তুতঃ আস্থার এইসব কূট তর্ক-বিতর্কে
জন্ম, ঈশ্বর অতিক্রম করা সত্য ।
কেউ কেউ ধিক্কারে ধিক্কারে পূর্ণ করে পেয়ালা
তারপর গরলে গরলে জ্বালিয়ে দেয় আত্মা
তারা বলে- ধ্বংসই সৃষ্টির মূল
তারা বলে- এইখানে মানুষ পাঁকের তৈরি।
কারো মতে- পাঁক আর মাটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
মানুষ মাটির সন্তান।
অতঃপর মাটিই তাকে মিশিয়ে নেয়।

জীবন আমার কাছে কখনও একটা আলোর গোলক
যা থেকে বিচ্ছুরিত পাপ, পুণ্য, প্রেম, ঘৃণা, অন্ধকার
অতঃপর জীবন আমার কাছে কখনও গোধূলি
কখনও প্রভাত হয়ে ফিরে আসে।
অন্ধকার রাত্রি অথবা ঝাঁঝালো রোদের ভেতর দেখায়
পলাতকা নদীর বিষণ্ন ক্লান্ত নুপুর।
সবশেষে এইসব অভিজ্ঞায় আমি জেনে যাই
জীবন, অর্বাচীন বালকের হাতে এক
হাওয়াই মিঠাই।

শিলালিপি

শৈশবে পালা মোরগের জন্য খুব কেঁদেছিলাম
যার টুটি ছিঁড়ে নিয়ে ছিলো ইঁদুর।
চাপ চাপ রক্ত পড়েছিলো আমাদের উঠানের মাটিতে।
মা দেখে বলেছিলেন-
আহ্ কি অবুঝ দেখো, কেউ মোরগের জন্য কাঁদে?

মা কি জানতেন কতটা অবুঝ আমি
কত রাত কেঁদে যাব।
কত জোৎস্নায় নোনা জলে আমার হাতের তালু
পুকুর হয়ে যাবে।
নিশি লাগা মানুষের মতো হেঁটে যাবো আর হেঁটে যাবো
আমাকে কঠিনে রেখে অসময়ে ঘুমিয়ে যাবেন
আর আমি অবুঝের মতো তার মুখ খুঁজতে খুঁজতে
চিনে নেবো জগত সংসারের শিলালিপি।

মা কি জানতেন
কত বর্ষায় নত হয়ে থাকবো এক বিন্দু জলের প্রার্থনায়
অগ্নুৎপাতের লাভায় ঝলসে যাবে সর্বাঙ্গ
কালো ক্ষতে মলম ঘষতে ঘষতেই বেহিসেবী
কেটে যাবে আমার আহ্নিক গতি, বার্ষিক গতি।
মতিছাড়া মানুষের মতো মায়ার কারু বিপণি খুলে রেখে
সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খরিদ্দারের আশায়
অপেক্ষায় থেকে যাবো অনন্তকাল ।

মা কি জানতেন
বারবার আমি শুধু দেখেই যাবো
আমার পোষা মোরগের ঝরা পালক, রক্তাক্ত শরীর
এই পৃথিবীর মানুষের মতো আমি
কোনোদিন বুঝের মানুষ হয়ে উঠবো না।

জন্মদাগ

আজই প্রথম জন্মদাগ দুটো দেখলাম
একটা গোল আর একটা চৌকো
তোমার বগলের একেবারে কাছ ঘেষে ,
ধবধবে চামড়ায় ঈষৎ লাল আর গাঢ় বাদামী
কতদিন কতভাবে উন্মুক্ত হয়েছো আমার কাছে
তবু চোখে পড়েনি এমন নগ্নভাবে ।

দু’উরুতেই মিশে আছে আমার জন্মদাগ।
এই এতোগুলো বছরে তুমি কি তা দেখেছো?
কেন জানি মনে হচ্ছে দেখোনি।
অথচ দুজন খোলা বইয়ের মতো দুজনের কাছে
সাতাশ বছর পর দাগদুটো দেখে মনে হলো
এতোটা বছরে হৃদয়ের কত দাগ তোমার অজানা।
আমার আড়ালে রয়ে গেছে তোমার কত!

খোলা বই পড়া হলেও কত পড়া বাকি রয়ে যায়
কত লাইন যায় না বোঝা কোনো কালে।

আলো দেখি না

আব্বা ভোররাতেই ডেকে বলতেন,
জানালা গুলো খুলে দাও না কেন
দরজাটা খুলে দাও।
সকালের হাওয়া আসুক, আলো আসুক।
‘আব্বা আপনি ঘুমান এখনও অনেক রাত ’
রাত কোথায়? এই তো কত আলো।

মাঝে মাঝেই আমাকে তাড়া দিতেন-
বসে আছো কেন?
মেহমানদের শরবত এনে দাও
তখন জানালায় ঝিম রোদ,খা খা দুপুর।
মানুষ কোথায়? সানসেটে বসা শুধু দুটো কাক
‘আব্বা আপনি কি যে বলেন- কোথায় মেহমান’
প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে তখন বলতেন-
‘বাড়িতে জেফত হচ্ছে। উঠান ভরা মানুষ
বৈঠকখানায় দস্তরখানা বিছিয়ে সবাই বসেছে
মেহমানরা ঘরে পাতা দই খাচ্ছে।
আর তুমি কিছুই দেখো না?’

শেষ বয়সের ছানি পড়া চোখেও
বাবা আলো দেখতেন, মানুষ দেখতেন
আমার ঝকঝকে তরুণ চোখেও
আলো দেখি না, মানুষ দেখি না।

বন্ধু

রৌদ্র,ঝড়,বৃষ্টি রাত,শব্দ আর গন্ধ
অতিক্রম করে আমরা দুঃখের পরশ পাথর খুঁজি।
জলের আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখে
বুঝে নেই আমরা সহযাত্রী।
দীর্ঘ পথ হেঁটে যেতে হবে।
তুমি বল-হাঁটবার আগে আলিঙ্গন প্রয়োজন।

ঘন বর্ষণের রাতে, নীল নীল দুঃখগুলো
পাজাকোলা করে আমরা যখন মুখোমুখি
গন্তব্যহীন অন্ধকারে মিশে থাকা স্বপ্নের লাশ নিয়ে
আরো একবার জীবনের দিকে যাত্রার কাছাকাছি
আসন্ন মৃত্যূকে আড়াল করে টেনে রাখা
আমার দু’চোখের কাজল দেখে তুমি বল-সুন্দর।
সুন্দরে চুম্বন রাখতে হয়।

বিবর্ণ ঘাসের মতো আমরা যখন নেতানো,নির্জীব
আনন্দের আরাধনায় নত,উদ্বাস্তু
মৃত মানুষের চোখের মতো নিষ্প্রপ্রভ, উত্তাপহীন
আস্তিনের লুকানো জেবের ভেতর থেকে
এককণা আলো বের করে
আমি বলি- প্রার্থনাই আনন্দের সঙ্গীত।
কবিতার শরীর র্নিমিতিই আমাদের প্রার্থনা
তুমি বল-ষ্পর্শই শ্রেষ্ঠতম আনন্দ।

ক্লান্ত বিশীর্ণ জগতের ধুমোট অন্ধকার নিয়ে
আমরা যখন বিভ্রান্ত, অুলান্ত বিস্মৃতি নিয়ে ঘমার্ত,
মরুময় পিপাসায় জরাক্রান্ত,
চোখের অবশিষ্ট নীল একত্র করে আমি বলি-
হাত বাড়িয়ে দাও। বন্ধুত্বই অসীমত্বের নির্দশন
ক্রন্দনের এখনই উৎকৃষ্ট সময়।
তুমি বল- সঙ্গমই সবচেয়ে গভীর বন্ধুত্ব

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *