দ্বিতীয় খুন
মনির বেলাল

আমির তার হাতের ব্যাগটি রুহির হাতে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, মা ফোন করেছিল? ফোন পাওয়ার কথাটি মাথা নেড়ে স্বীকার করে রুমের গভীরের দিকে পা বাড়াল রুহি। জুতা-মোজা খুলে, দরজাটি লাগিয়ে আমির রুমে এসে দেখল, রুহি শশা কাটছে। তার দিকে তাকাল না পর্যন্ত। আমির ওয়াসরুম থেকে ফিরে এসেও রুহির মুখমন্ডলের কোন পরিবর্তন দেখল না। সে তাকে পেছনে থেকে জড়িয়ে ধরে বলল, কী হয়েছে ম্যাডাম, মুড অফ কেন? কোন রকম ভান চলবে না আজ। রোজ রোজ কোন না কোন অজুহাত! আজ এক্কেবারে! বলে আমির রুহিকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু রুহি এক ঝাটকায় খুলে দিল আমিরের হাতের জোড়া। রুহি এখনও তার মুখ শামুকের মতোন এঁটে রেখেছে। ফ্লোর ছেড়ে খাটের উপরে গিয়ে বসল আমির, মোবাইলটি বের করে এলোপাথাড়ি চলতে লাগল নেট দুনিয়ায়। আর রুহি তরকারীর কড়াই হাতে গেল রান্নাঘরের দিকে। তরকারী গরম না হলে- আমির খেতে চায় না। রান্নাঘর থেকে ফিরে এসে রুহি দেখল, মুখভারের রোগটি এরইমধ্যে আমিরকেও আক্রান্ত করে ফেলেছে। সে খাটের উপর আড়াআড়ি শুয়ে আছে- দেয়ালের দিকে ঘুরে। রুহি বলল, আসো খেয়ে নাও। তরকারী ঠান্ডা হয়ে যাবে। আমির বলল, কী হয়েছে? তার এবারের প্রশ্নটির ওজন ও গভীরত্ব দুই-ই বেশি। রুহি শুধু বলল, আগে খেয়ে নাও। কিছুই হয়নি। এমনি আমাকে ভাল লাগছে না। জোরে নেমে আসো। রাত হয়েছে। রুহি যা বলল, এইটা যে আসল ব্যাপার নয়, এতোখানি আমির বুঝতে পারছে। তবে এ মুহূর্তে আসল ব্যাপারটির সন্ধান পেতে হলে খেতে বসা ছাড়া বিকল্প কোন রাস্তা নেই। তাছাড়া তাকে ক্ষুধাও লেগেছে প্রচন্ড। আজ ফিরতেও দেরি হয়ে গেছে। বাসাতে ঢোকার সময়ই সে দেখেছিল, বারোটা দশ। রাত এগারোটার আগে কোনদিনই সে মার্কেট থেকে ফিরতে পারে না। ফার্মেসীতে বসে ঐ গ্রাম্যগুলোর ডাক্তারগুলোর পরিবারিক-সামাজিক সবধরনের অর্জনের গল্প শুনতে হয় আগে, তারপর তাদের কাছে ওষুধের অর্ডারের কথা তোলা চলে। এভাবেই রোজ তার আরো দেরি হয়ে যায়। এক পিলেট ভাত আমির যেন তার গলার ভেতরে ঢেলে দিল। দুজনের মুখই বন্ধ, কেউ কোন কথা বলছে না। থালা-বাসন গুছিয়ে রেখে রুহি বিছানায় এলে আমির আবারও বলল, কী হয়েছে? রুহিও এবার তার মুখ খুললো। কিছু না, মা বলছিল আমরা কবে যাবো। তুমি কী বললে? কী আবার- বলেছি তুমি আসলে, জানাবো। আমার তো যা অবস্থা। বৃহস্পতিবার রাতে আমি যাবো। তুমি আগেই চলে যাও। প্রয়োজনে আগামী পরশু ভোরের গাড়িতেই তুমি চলে যাও, সন্ধ্যায় হতে হতে পৌঁছে যাবে। শুক্রবার আছে, আমি তোমাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসব। কিন্তু তার আগে ম্যাডাম এদিকে আসেন, কমপক্ষে তো পনের দিনের বিরতি… বলে আমির রুহিকে আয়ত্তে নেওয়ার চেষ্টা করল। তবে রুহি বিছানাতে উঠে বসল। গলাতে ভর দিয়ে বলল, না, আমি যাবো না। আমিরও উঠে বসল, ধুর! তাই বললে হয়। জান্নাত আমার একটা মাত্র বোন। বাড়িতে মা-বাবা ছাড়া আর কে আছে? বিয়ের এতো কাজ-এতো ঝামেলা মা একা কিভাবে সামলাবে? তুমি আমার সাথে গেলে হবে না। মা, আমাকেও ফোন করেছিল। মাও বলছিল, তোমাকে কালকেই পাঠিয়ে দিতে। আমার চিন্তা করতে হবে না। সাত-আটটা দিন আমি তরকারি গরম করে খেয়ে নিবোনি। তুমি এক কাজ করো, ফ্রিজে মাছ আর মুরগি যা আছে রান্না করে রেখে যাও, তাহলেই হবে। এখন এদিকে আসেন।

রুহি গলা চেড়ে বলল, না, আমি আগে না, তোমার সাথেও যাবো না। আর কোন দিন আমি তোমাদের বাড়িতে যাবো না। উঠতে-বসতে, তোমার মায়ের ঐ খোঁচা মারা কথা শুনে শুনেই আমি ঠিক থাকতে পারি না। বিয়ে বাড়ি মানে তোমার খালারা সবাই আসবে তারা, পাড়ার সব মেয়েরা ছি-বলা করে আমাকে ধরবে। কেউ কানে কানে, আবার কেউ সবার সামনে চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করবে, কী গো তোমারে ছেলেপেলের কী হল? আমি কতজনাক বলবো। আর কী বলবো? তোমরা সেদিন মেডিকেলে খালি তাকে খুন করোনি। আমাকেও খুন করেছো আমাকেও। আমারও মা হওয়ার শক্তি আল্লা দিয়েছিল। কিন্তু তুমি আর তোমার বাবা মিলে সেদিন শুধু আমার সন্তানকে খুন করোনি, আমার মা হওয়ার শক্তিকেও কেড়ে নিয়েছো। এখন আমি প্রতিদিন মরি! তোমাদের বাড়ির মানুষের প্রতিটি কথাতে আমি মরি! এ কথা তুমি এখন বোঝো আমার ধারণা বোঝো না। তুমি তো এখন মানুষের শরীরের অসুখ-বিসুখ সাড়ানোর ওষুধ বেঁচে বেড়াও, মনের অসুখ এখন আর তোমার চোখে পড়ে না আমির, চোখে পড়ে না।

কী মরদ তুমি? সেই দিন রাতে তো অনেক বড় বড় কথা বলছিলে। আমি তোমাকে বার বার থামাতে চেয়েছি, আমি বার বার বলেছি, আমির সীমানা ছাড়িয়ে যেওনা। পরে পস্তাতে হবে। কিন্তু তুমি শুনলে না, দুনিয়া উল্টে দেয়ার সাহস দেখালে কিন্তু তারপর, সত্যিই যখন তোমার হিরো হওয়ার দরকার ছিল, তখন তুমি আর হিরো হতে পারলে না। তুমি তখন হারিয়ে গেলে সাধারণের ভিড়েছি! আমির তুমি বুঝতে পারো, আমি তোমাকে আর তোমার বাবাকে মনে মনে কতটা ঘৃণা করি। তোমার বাবার দোষ কী? তিনি তার কথা বলেছেন, তার কাজ করেছেন। কিন্তু তুমি, তুমি তোমার কথা রাখতে পারো নি। তুমি খুনি আমির, ইউ আর এ কিলার! তুমি আমার বাচ্চাকে খুন করেছো, আমাকেও খুন করেছো তুমি, আমাকেও।

বেলকুনির কাছে আকাশটা অনেকখানিই বড়। রুহি ঘর ছেড়ে বাইরে এলো সে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। এখন তার দুগালে যেন দাবানল ছুটে যাচ্ছে। বছরের পর বছর যেই দাবানল তার বুকটাকে কেবলি পুড়িয়েছে। কয়েক মিনিট পর আমিরও চুপচাপ বেলকুনিতে এসে দাঁড়াল। এই বেলকুনির লাগোয়া আর কোন বাসা নেই। এপাশে লম্বা একটা জলাভূমি বর্ষায় জলের ঢেউয়েরা এখানে থইথই খেলা করে। আর শীত শেষে সরষের হলুদ ফুলে ফুলে ভরে উঠে এ জলাভূমির কালো শরীর। জলাভূমির কলমিলতা আর শাপলার পাল্লা দিতেই বোধহয় আজ ঐ আকাশও মেখেছে কাঁচা জোসনার রঙ।

সেদিন রাতও ভেসে যাচ্ছিল এমনি জোসনার রঙে। আমির ও রুহি দুজনের বাড়ি নারদ নদের দুইপাড়ে। রুহির বাবার আর্মির চাকরি, বিদেশে আছে। বাড়িতে মা আর ছোট্ট একটা ভাই ছাড়া আর কেউ থাকে না। তাই রুহি একটু চেষ্টা করলেই রাতে বাইরে বের হতে পারতো। তবু জোসনা প্রতাপ দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিল রুহি। আমিরকে ফিরে যাওয়ার জন্য বার বার সে ম্যাসেজ দিয়েছিল! কিন্তু কোন কথা শোনেনি আমির, এক সময় তার জেদের কাছে হার মানে রুহি। নারদ নদ পুনঃখননের কাজ চলছিল তখন। নারদের ঐ কাঁচামাটির ঘ্রাণে সেদিন সত্যিই মাতাল হয়ে গিয়েছিল দুজন। হাসতে হাসতে তারা সেদিন পেরিয়ে গিয়েছিল সীমান্তের শূন্যরেখা। পরের দিন সকালেই ওষুধ এনে দিয়ে ছিল আমির কিন্তু কোথায় থেকে কী হয়ে গেল। খোদা জানে!

অনার্স পাশ করেছিল তখন দুজনেই। বিয়ের ব্যাপারে রুহির পরিবারের দিক থেকে তেমন কোন আপত্তি ছিল না। তারপরও এমন একটা অঘটন। আর কার কী বলার থাকে? তবে আপত্তি ছিল আমির বাবার! সে কোনভাবেই এ বিয়েতে মত দিবেন না বলে মাড়ি এঁটে বসেন। পরে সব বুঝে, তিনি বিয়েতে মত দিতে এক রকম বাধ্য হোন। ঘোল বছর ধরে, সে ঐ চর শ্যামপুর গ্রামের জুম্মা মসজিদের ইমাম। সাথে ওখানকার হাইস্কুলের মৌলবি স্যার। বিষয়টা কোনভাবে জানিনি হয়ে গেলে, তার মান-সম্মান বলে কিছুই আর থাকে না। কিন্তু তার দাবি ছিল, রুহির পেটের পাপের ফসলকে নষ্ট করে দিতে হবে। এবং তাও অতি গোপনে। তারপর দুজনকে তওবা করতে হবে। তারপর বিয়ে। আমিরের বাবার সব শর্ত সেদিন সবাই মেনে নিয়েছিল। রুহি কিন্তু কিছুতেই এতে রাজি হচ্ছিল না। তার কথা, আমি আর আমির চাকরি নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবে। অনেকদিন আর এদিকে আসব না। আর কে এসবের হিসাব করে রাখবে? আমিরের বাবার দাবি, কতদূরে, আল্লাহর আসমান-জমিনের বাইরে? তাদের আমার সামনে এসে তওবা করতে হবে, আমিও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবো। রুহির পরিবারের কেউ বা আমির নিজেও সেদিন তার কোন কথা শোনেনি। আমির বলেছিল, এ রকম ঘটনা মেডিকেলে অহরহ ঘটছে, প্রতিদিন। তোমার কোন ভয় নেই! তারপরও একটা চাকরি-বাকরি ছাড়া বাচ্চা মানুষ করবো কি করে হু?

গতমাসে ওদের বিয়ের সাত বছর পার হয়েছে। এরমধ্যে মাত্র বছরখানেক ওরা গ্রামে ছিল। ওষুধ কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে জানাশোনা ডাক্তারের সংখ্যাও কম নয়। বড় বড় ডাক্তারের উপর থেকে তাদের ভরসা উঠে গিয়েছে। করম আলীর মাজারেও তারা গিয়েছিল। সেখানকার খাদেমের দোয়াও তারা নিয়েছে। নিয়ম মেনে চলছে হোমিও ওষুধ। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *