ত্রিকাল-নব্বই দশকের কবিতা

কবিতা:
সরকার আমিন ‖ অনিকেত শামীম ‖ জাকির আবু জাফর ‖ ওবায়েদ আকাশ ‖ মুজিব ইরম ‖ রাতুল হরিৎ ‖ মিলু শামস্ ‖ রহমান মুজিব ‖ কামরুজ্জামান ‖ রুহুল কাদের ‖ হামিদ রায়হান ‖ চিনু কবীর ‖ নূর কামরুন নাহার ‖ ফরিদ ভূইয়া

ত্রিকাল
শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক ছোটকাগজ
৫ম সংখ্যা
ফেব্রুয়ারি ২০২১

সম্পাদকীয়ঃ
শিল্প-সাহিত্য চলে গেছে হীরক রাজার বারামখানায়। সেখানে সে ডুগডুগি বাজায় আর এটাওটা কুড়িয়ে খায়। এই বৃত্তি যারা অপছন্দ করে এবং সাহিত্যের মূলধারাকে যারা নদীর ক্ষীণ স্রোতের মতো হলেও বাঁচিয়ে রাখতে চায়, তাদের অন্যতম যোদ্ধা লিটলম্যাগ আন্দোলন। সে আন্দোলনের একজন নগন্য অংশীদার হিসেবে ত্রিকাল বরাবরই লেখার গুণগত মানকে প্রাধান্য দিয়ে আসছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এবার সে আরও সমৃদ্ধ। গত বিশ বছর ধরে নরসিংদীসহ অন্যান্য জেলার কবিগণ কী ধরণের কাজ করছেন, তাদের মান কেমন, সে-সাথে নব্বই দশক থেকে তাঁরা কতটুকু এগিয়ে এসেছে, তার একটা সংকেত নিয়ে ত্রিকাল এবার পাঠকের সামনে হাজির হচ্ছে। থাকছে সময়ের উল্লেখযোগ্য পাঁচজন কবির গুচ্ছ কবিতাসহ সমৃদ্ধ গল্পভাণ্ডার এবং তিনটি প্রবন্ধ।
এ সংখ্যার পেছনে বিজ্ঞাপন দিয়ে সহযোগিতা করার জন্যে পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম অংশীদার গ্রিন জেনেরিক সংগঠনকে জানাই অভিনন্দন। সে-সাথে যারা লেখা দিয়ে সাহায্য করেছেন তাঁদের প্রতি রইলো আন্তরিক ভালোবাসা।

সরকার আমিন
আবার জন্ম হলে

মানুষের আসলে জন্ম হয় বারবার। মৃত্যুও হয় বারবার। ‘আমারে তুমি অশেষ করেছো এমনই লীলা তব’!
আবার জন্ম হলে আমরা একই হাইস্কুলে পড়াশোনা করবো। ঘাস ফড়িং-এর পিছু ধাওয়া করতে করতে চলে যাবো উছালিয়া পাড়া। একটা কাঠের সেতু। নিচু দিক থেকে বহমান বৃষ্টির ধারা। ভিজতে থাকবো।

সারারাত বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে ঘুম যাবো সকালে। মসজিদ থেকে ভেসে আসা নির্ভেজাল আযানের সুরে ঘুমুতে যাবো; ঘণ্টা বাজবে মনমন্দিরে; আমাদের সব পোষা কাক কা কা করে বিরক্ত করার চেষ্টা করবে; আমি বিরক্ত হবো না, ঘুমুব।

আবার জন্ম হলে আমি তোমাকে টেলিফোন করবো বুদ্ধিজীবীদের হাট থেকে। ট্রাংকল। তোমার মামি আমাকে জিজ্ঞেস করবে, আচ্ছা, বিয়ে যে করতে চাও কত বেতন পাও তুমি?

আবার জন্ম হলে তাকিয়ে থাকবো আধা-পাকা ধানক্ষেতের দিকে। হেঁটে যাচ্ছো তুমি গোধূলির দিকে। তোমার ধ্যানমগ্ন মুখের দিকে চেয়ে রব বেলাজার মতো।

মানুষের জন্ম হয় বারবার। আশা করি, আল্লাহ মানুষকে বারবার জন্মাবার অনুমতি দেবেন।

অনিকেত শামীম
দূরাগত পাহাড়ের সুর

আজও পাহাড় দেখার তীব্র বাসনার কথা মনে হলে
চুপিচুপি তোমাদের গ্রামে যাই। আজ হাটবার…
প্রচন্ড ভীড় ঠেলে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়–তে থাকি —
বড় রাস্তা থেকে আলপথ
আলপথ থেকে ক্ষেতের কোণাকুণি…

শস্য কাটা হয়ে গেলে পড়ে থাকে হাহাকার

বিরাণ মাঠে আমাদের প্রেম-পর্ব
গোল্লাছুট দাড়িয়াবান্ধা
দীর্ঘশ্বাস বুকে নিয়ে পড়ে থাকে শূন্য মাঠ…

সেই তালগাছ বরাবর হাঁটতে থাকি
যতোই নিকটে যাই পাহাড় ততোটা সরে সরে যায়
এভাবে কতোটা সময় জমা হয় জীবনের খাতায় ?
বরং হাটের ভীড়ে মিশে যাওয়া ভালো
হাট মানেই অনন্ত শৈশব, জাগ দেয়া পাটের গন্ধ…

উজান বাতাসে ধূসর নস্টালজিয়া
দূরে কোথাও বাঁশি থেমে গেছে
নিরন্তর প্রবাহমান তার রেশ হঠাৎ হঠাৎ
থমকে দাঁড়ায় রাখালিয়া বোহেমিয়ান…

শৈশবের আরেক নাম হাহাকার– হারিয়ে যাওয়া প্রবেশ পথ…

জাকির আবু জাফর
গুছিয়ে নেবার গল্প

বাবার হুকুম ছিলো- সবকিছু ঠিকঠাক গুছিয়ে নেবে
ভোর হলে চোখ থেকে ঘুমগুলো গুছিয়ে নিতাম
স্বপ্নগুলো গুছিয়ে রাত রেখে দিতাম মশারীর ভাঁজে
রাতের সমস্ত দাগ ঝেড়ে বিছিয়ে দিতাম দিনের তরিকা

মক্তব-শিক্ষক বলতেন চুলগুলো গুছিয়ে নাও
চুল গোছগাছ করে গুছিয়ে নিতাম মুখও কেননা উস্তাদ মুখে দেবেন খোদার কালাম
এত কণ্ঠ, ডানে বাঁয়ে, এত যে শব্দের ধ্বনি শিক্ষক একাই ধ্বনিগুলো গুছিয়ে নিতেন
বলতেন মনটি গুছিয়ে রেখো বুকের ভেতর, কেননা
মনই বেসামাল হয় আজীবন কৈশোরের সকালগুলো আজো জ্বলে স্মৃতির জেহেনে
উঠোনের রোদগুলো গুছিয়ে নিতাম নাস্তার টেবিলে
মা বলতেন- টেবিলের ছায়াগুলো ঝেড়ে রোদগুলো রেখে দাও
আমরা ছায়া ঝেড়ে রেখে দিতাম টেবিলের তলে নাস্তায়
রোদের ঝোল ঢেলে জুড়িয়ে নিতাম ঝাল শরীর গুছিয়ে নিতে গোগ্রাসে গিলতাম
দর্পিত দুপুর চারিদিক থেকে ছায়াগুলো গুছিয়ে রেখে দিতো গাছের নীচে
গাছও গুছিয়ে নিতো ছায়ার শরীর ভাবি আলো তীর্যক হলেই কেনো ছায়া ছোট হয়ে যায়
পাখির ফিরতি সুর মিশে বাঁশবন থেকে নামতো সন্ধ্যা
সন্ধ্যার মৌনতা গুছিয়ে রাখতাম বইয়ের ভাঁজে
গভীর হলেও মশারিতেই থেকে যেতো রাত
কেবল জীবন গুছিয়ে নেবার তৃষ্ণায় গরুর মতো জাবর কেটেছি বইয়ের পাতায়
সবাই জীবন গুছিয়ে নেবার কথাই বলে জীবন গোছাতে গোছাতে দেখি- মৃত্যুই গুছিয়ে রাখে মানুষ !

নূর কামরুন নাহার
তোমার হাত ধরে আছি


মৃত্যূমাখা এ শহরে তোমার হাত ধরে আছি
জানি, অর্ন্তগত ক্ষরণ দেখে না নগরের কংক্রিট।
মৃত্তিকায় পড়ে না বনানীর ছায়া
প্রিয়ার ঠোটের বিশুদ্ধ চুমুতে লেগে থাকে কৃত্রিম রং।
জলাশয়ে মৃতমাছেরা ভেসে থাকে কাফন গায়ে।
আলোড়িত বৃক্ষের পাতায় ঝরে পড়ে
ফিলোমেনার বোবা আর্তনাদ।
তবু ঐ হাতে সর্মপিত এ হাত।
জানি, বেড়ে ওঠেছে নাগরিক বেওয়ারিস রাত।
পূর্ণিমার জোৎস্নায় ফোটো না সাদা চন্দ্রমলি¬কা।
চকচক করে জ্বলে কেউটের বিষাক্ত কিরীচ।
প্রতিশ্রæত প্রেমিকেরা পান করে লিথির জল।
ইকাসুরের ডানার মতো পুড়ে যায় স্বপ্নের শুদ্ধ শরীর ।
অবরুদ্ধ এ শহরে তোমার হাত ধরে আছি
উষ্ণতার ঘামে দুটো হাত হবে আজ লরেল পাতা ।

ওবায়েদ আকাশ
সৌন্দর্য জিজ্ঞাসায়

সারা মাসের ভুঁড়িটাকে ঘুরিয়ে এনে
একটা চারকোনা চাকরির ওপর বসিয়ে দিলে
একটি স্বাবলম্বী বিষাদের মুখ
পৃথিবীময় সৌন্দর্য জিজ্ঞাসায়
বারবার পরাজিত হয়
একবার এক মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতার
দাম্ভিক খদ্দের এসে বলল
তিনি যা আগে থেকেই শিরাউপশিরায় মানিয়ে নিয়েছেন
নিবস্ত্র সামুদ্রিক বালুকাবেলায় অপরূপা প্রতিযোগিদের
সম্ভাব্য পরিণতিতে তেমন কিছুই ঘটে উঠবে হয়তো
সারাদিনের যৌনাঙ্গের ভেতর যে বিভ্রান্ত ও অকার্যকর
শুক্রাণুগণ এখন পচাগলা নদী বা যে কোনো আঁস্তাকুড়ে
ভেসে যাবার অপেক্ষায়, তারা কেউ কেউ সাংসারিক
বিশ্বস্ততার দোহাই দিয়ে প্রতিযোগিতার অপ্সরাকুলে
পরিচর্যারত। কেননা অবগাহন মাত্রই সান্ধ্যপল্লীর নিভৃত ছায়ায়
ফুরফুরে তালের শাস্ খেয়ে বাড়ি ফেরা নয়, এই তথ্য
একদা কাঁধে ঝোলানো দীর্ঘশ্বাস থেকে
মাসান্তে পাওয়া চাকরির চেক ঘষতে ঘষতে বলেছিল কেউ
এ-কালের ভূমধ্য গোটানো লেজের ওপর একবার মাত্র
বৃষ্টি হলে পানান্তের উচ্ছ্বাসের মতো বেরিয়ে আসে সব
অনাহারি মায়ের জমানো মুদ্রায় কেনা সর্বোচ্চ জ্ঞান ও
গাঢ় বেদনার দাসত্বের কোট-টাই পরে ঘামছে নগর
সাত সমুদ্র পেরিয়ে শীতার্ত নির্জনতার ঝকঝকে দাঁতে
ঝোলানো বিশ্বময় সাদা হাড় ও নির্লোম মুখের
সৌন্দর্য জিজ্ঞাসায় তোমার অবাধ্য ভ্রমণ–
একবার কৃষ্ণ সাগরে একবার আরব্য মরূপ্রান্তরে
মুখ থুবড়ে পড়ে যাবার দৃশ্যে ব্যাকুল হয়েছে কেউ কেউ

মুজিব ইরম
উত্তর পাড়া

এই বার যাবো আমি উত্তর পাড়ায়।
দক্ষিণে পশ্চিমে পুবে কোনো দিকে নয়। উত্তরেই যাবো। উত্তর পাড়ায় তুমি থাকো কি থাকো না, ভাবি না তো আর। আমাকে কেবলি ডাকে উত্তরের পথ। ফাড়ি পথ। কাদামাটি পায়ে মেখে, বাঁশের হাকম পাড়ি দিয়ে, কারো বা উঠান, কারো বা পুকুর পাড়, কারো বা ঘরের বাজু ছুঁয়ে দিয়ে, ধানজমির আইল ঘেঁষে, ভাঙ্গা পথ ভাঙ্গা পুল লাফ দিয়ে, মাড়িয়ে সবুজ ঘাস, পাকুড় গাছের তল, ছায়ায় মায়ায়, জল ভেঙ্গে, শিল্লি দিয়ে, গীত গেয়ে বেসুরো গলায়, বৃষ্টি বাদলা মাথায় নিয়ে, চৈত্র মাসী রোদে, ভাদ্রের তাতানো দিনে, কোনো এক চন্দনির রাতে, কুয়া ভেজা সকাল বেলায়, কার্তিক বিকালে, মাঘের সন্ধ্যায়, মালজোড়া গেয়ে, ধীর লয়ে, এ-বাড়ি ও-বাড়ি দিয়ে, উঁকি মেরে, বাবরি দুলিয়ে, জোড় মন্দিরের পাশ ঘেঁষে, মসজিদের রাস্তায় পুরান কবরে ঘুঘু ডাক শুনে শুনে, যে কোনো ঋতুতে, যে কোনো বেলায়, যাবোই এবার আমি যদি বেঁচে যাই।

জেনে রাখো, এই বার ঠিক ঠিক যাবো আমি উত্তর পাড়ায়। তোমার বাড়িতে। ঘরবন্দি দিনগুলি শেষ হলে পর।

রাতুল হরিৎ
গদ্যকথার আয়না দেখি

মহাদুর্যোগ, করোনার এই কালে, যদি বেঁচে যাও, যদি বেঁচে যাই
দেখা হয়েই যাবে বন্ধু, মন মেলাবার মোহনায়
এই দেশে—হারানো সংবাদের নেপথ্যে শুধু
গুম হবার ছলা-কলা আর চোখধাঁধানো চাকচিক্যের চমকে
ভরসাবিহীন পথ চলা।
মৃত্যুর মৌতাতে মাতোয়ারা মানুষ, আপন সবই পর
এই কপালের ফেরে, ধুঁকে মরে
তবু ওঠে না কপাল ঘোরাবার ঝড়।
বাংলা ভাষায়, গণের কোন মাধ্যম নেই
তবুও নাম গণ-মাধ্যম, গণের নামেই চলে সব
গণের কপালেই জোটে, রাষ্ট্রীয় উত্তম-মধ্যম।
এই মাধ্যমে—গণের কোন সংবাদ নেই
গণের নেই কোন মালিকানা, আছে শুধু গণস্বার্থবিরোধী
রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা—জনের তেলে জনতা ভেঁজে
নেতারা মজা লুটে, রসের গোল্লায় গুল মারে ওরা
পাসতো নৈশ ভোটে।
ত্রাণেতো নেই পরিত্রাণ, লুটপাটের পাপ-তাপ
দলদাসদের পিঠে পড়ে, প্রাপ্তিযোগের ছাপ
শুধু প্রাপ্তিযোগের ছাপ।
ত্রাণকর্তাদের মোবাইলবাজি, ত্রাণতো দেখি না
ত্রাণ চলে যায় ভুল ঠিকানায়, ও মন তুই মানুষ হৈলি না!
মানুষের কথা শোনে না ওরা, ভাবে না দেশের কথা
ব্যক্তিপূজায় মত্ত ওরা, বোঝে না স্বাধীনতা?
ব্যক্তির থেকে দল বড়, দলের থেকে দেশ
এই কথাটা প্রাচীন অতি, বাতিল অবশেষ;
এখন চলে উল্টো কথা, দেশের থেকে দল বড়
দলের থেকে ব্যক্তি।
পদ্য নয়গো গদ্যকথা, কলবের আয়নায়
নিজেকে একটু দেখে নিয়ো, কি মিলেছে আর কি মিলে নাই।

মিলু শামস
অজ্ঞাতনামা কষ্ট

ঘরগুলো চলে গেল স্রোতের টানে
যে যার মতো
উঠোনজুড়ে বিষাদের তানপুরা
রিনঝিন নৃত্যরত ;
একটি চড়ুই ডানাভাঙ্গা হিমে
ছটফট করে সজনেতলায়
ঘরগুলো ভেসে যায়–
যে যার মতো;
একটি উঠোন পুকুর হয়
বুকে নিয়ে অজ্ঞাতনামা কষ্টের স্রোত।

রহমান মুজিব
শরৎ এবং সে

বিলের গ্যারেজে অপেক্ষারত কাশের সাদা এ্যাম্বুলেন্স
সবটুকু ব্যথার ধূধূ নিয়ে উড়বে বকের শহরে
যেখানে পশ্চিমের গাল বেয়ে গলে পড়ছে বিকেল
আর আশ্বিন টানা দূরত্বে আমাদেও অশ্রæর নদী

নদীর ওপাড় ধ্যানমগ্ন রাতে ঢলে পড়ে চাঁদেও মায়াডাক
শিশিরে সেম্পু করা ভোরের গ্রামে বসে হৃদয়ের হাট
মানুষের মন হতে উড়তে থাকে গরম ভাতের উচ্ছ¡াস

আকাশে নীল চিঠির ডাক, পায়ে লেগে আছে মেঠোপথ
খুঁজে দাও তার ভাব জমানো চোখের আদর।

রহুল কাদের
সময়ের ফেন

নিয়ন বাতির প্রকোপে মৌলিক রাত নেই নগরপাড়ায়
অজীর্ণ আঁধারের গলায় অস্বস্তির ঢেঁকুর;
মানুষের রক্তধারা ফিকে, আর লাল নেই। তড়পায় নীলচে নেশায়-
আত্মার পেট অনাহারে বধির।
বোধের আকাশ গুমোট সিঁদুরে মেঘের ছায়ায়

    চেহারায় ক্ষত ও খুঁতে সুরভি প্রসাধনী মেখে 
       সময়ের গণিকা ডাকে শরীরী মেদে আর ক্লেদে-
          আত্মার পরিতৃপ্তির তীর্থ কোথায়?

দর্শনের ফুটন্ত কড়াই কালের কোবিদদের মুখ, অখাদ্য শস্যের মতো
খুন, হিংসা, ধর্ষণের বাম্পার ফলনের দুঃসংবাদ
গণমাধ্যমে রসের ঢেউ তুললে
কোমরে নাচের মুদ্রা এঁকে রচনাসমগ্র বগলদাবা করে
সমাধি ছেড়ে ওঠে আসেন সিগমুন্ড ফ্রয়েড;
বিবেকের কলকব্জা বিকারে বিকল। দিনের পোষাক পরে তেতে ওঠে রাত
হরপ্পার নিয়তি নিয়ে চেতনাচেতন নৈরাজ্যের আধ ছেঁড়া নাভিমূল ছুঁয়ে ঝুলে আছে
শুয়ে আছে, জেগে আছে নিরবলম্ব সময়।
কদাকার স্বপ্নদৃশ্যরা লাফায় রাতজুড়ে চোখের প্রেক্ষাগৃহে-
কুণ্ডলিত কিছু লোক কালো জুতার ভেতর অন্তর্হিত হয়। স্ফীত জুতা
আবার রোদদীপ্ত সুডৌল মানুষ হয়ে যায়।

জুতা কি মাতৃগর্ভ! মহান মানুষদের জন্মআড়ত?
এমন দুঃস্বপ্ন দেখায় কোন হঠকারী বাজিকর?

ত্রিকালজ্ঞ কবিকুলের চোখে বয়ে যায় ঘোলাজলের নদী
ক্রিয়াপদহীন প্রতিক্রিয়ার সুড়সুড়িতে মর্মমূল ভিজে না আর
নন্দনকাননে ফুটে খুব- নির্গন্ধ গাঁদাফুল, ফেঁপে ওঠে সাময়িক ফেন
নারীরাও ধাঁধায় দ্বিধাগ্রস্ত। যে লোভে কাছে আসেন
সে ক্ষোভে ফিরে যান পড়শিনী সুমিত্রা সেন।

হামিদ রায়হান
হাত পাতা শূন্যে

বসে পড়ো স্তব্ধ আরো কিছুক্ষণ নক্ষত্রের পাশে
সবকিছু ভেঙে পড়ছে, এই ধরো, ধর্ম ও মানুষ
আমাদের দিনরাত্রি, ছোট ছোট আলাপচারিতা
হাত পাতা শূন্যে দেখি ভাষাও চুল আচড়াচ্ছে

গাছ, লতাগুল্ম, মীনদের সঙ্গে চল পুষ্পরেনু
ঘুমন্ত শিশুর মুখও ভ্রমণশীল পাখিদের দিকে
বনের গভীরে জ্বলমান চূড়ান্ত হেঁসেল, অতর্কিত
অন্তরাল ছিঁড়ে যদি জাগে সূর্য, দেবদারু গাছ

ঝরছে পাতা ম্লান: মানুষের বোধ, প্রতাপ, আকাক্সক্ষা
সমস্ত পৃথিবী চুপ প্রতিধ্বনি আজ আমাদের ভাঙছে
ধূলিমেঘে বীজ ও পোকা ঢাকা শস্যের খামার
যেদিকে তাকাবে প্রতিটি মুখ ঈর্ষা ও ভ্রান্তির খেলা
চল নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রেলবাঁক জলসীমানাব্দি
সেদিকে বৈশাখ, হ্যামিলিয়ন, আমাদের অবিশ্বাস

চিনু কবীর
বিনয়শূন্যতা

ইলিশবাজারে গেলে মুশুলধারে বৃষ্টি,
আজ বর্ষায় হাত ধরাধরি করে
খুব ভিজতে বেড়িয়ে পড়ি
ভেজা শরীরে গরম চায়ের তেষ্টা,
সঞ্চয় ভেঙ্গে জমে ওঠা সুখের ভেতর
ক্রমনদী পার হতে গিয়ে যোগসূত্র হারিয়ে ফেলি-
কোন এক সরস দুপুরে টেবিলের পাশে
গণিত নিয়ে ভাবতে বসলে-
কোথায় যেন বিনয়শূন্যতা,
শাল পাতার নিঃশব্দ পতন
মাকড়সার জালে বিন্দুবিন্দু জলের মেলা
কবির শব্দ, রেখা এতোটা সংকেতবাহী
যদি ভুল ভাঙ্গে তবে ফিরে এসো একা-

গায়ের সমস্ত পানিটুকু মুছে দিবো
তুমি কাছে টেনে নিও এ বেলা…

কামরুজ্জামান
মানুষের মুখ

দূরে কোথাও অজানা রেল স্টেশনে বসে থাকি একা
কনক্রিট এর বেঞ্চ গুলোতে,টিকেট ঘর, ছোট্ট প্লাটফর্ম
মানুষের মুখ দেখি বিচিত্র অবয়ব, যাত্রী সাধারণ।
ঝমঝম করে রেলগাড়ী আসে অজস্র মানুষ নিয়ে –
বাতাসের তরঙ্গে সিটি কত দূরান্তে ভেসে চলে যায়
অপরিচিত প্লাটফর্মে নিঃসঙ্গতাকে করি উদযাপন।
সামান্য কোলাহলে একাকী নিজের ভেতর তালাশ করি
নিজেরই সাকার, ভালোবাসার জন্য কিউতে দাঁড়াই –
কোথাও যাব না, কোনো গন্তব্য নেই আজ এখন।
যৌবন উৎসর্গ করে চরম পুলকে রতি রসে
সিক্ত করে বিন্যস্ত করেছ মহার্ঘ নিবেদন –
তারই কথা মনে আসে বারবার সারাক্ষণ।
কেনো এত ত্যাগের মহিমা তোমার জানিনা কিছুই
অবহেলা অপ্রাপ্তি অপমানে ভরে আছে যে জীবন
কোন বিন্যাসে ভরিয়ে তুলবে বল এই মধু ক্ষণ,
কোথাও কিছু সঞ্চয় নেই শুন্য মনি কাঞ্চন _
ভাবি একা একা, কোন অলংকারে মূর্ত হবে তুমি
জানি আছে শুধু আমার অজস্র অমৃত চুম্বন।

ফরিদ ভূইয়া
দ্বাদশী এখন তার

এখন মধ্য অগ্রহায়ণ
ঋতুর রীতিতে কুয়াশার রাত।
আবহাওয়া সংবাদের উদ্বেগ রেখায়
কোনো উঠা-নামা নেই
তবে কেন চোখেতে ঘূর্ণির ঝড়ো সংকেত –
অসময়ে নোনাজলে ভেসে যায় পলিমা সরল
বুকের আবাদী জমি!
একদা পুড়েছে ঠিক, স্বপ্নবোনা তাহার অতীত।
গেলো সহস্রাব্দের বিপন্ন শত বেপথু বিকেল
হাতে হাত রেখে ধীরে, নিয়ে গেছে তাকে
অনিবার্য রাতের আঁধারে।
তাকে দেখে
হননের একগাছি রশি দোল খেতেখেতে এতটা ডেকেছে
ভয় ও বিষণ্ণতায় সেই দীর্ঘ রাত…
সবকিছু ভেদ করে সে ফিরেছে, ঘুরে দাঁড়িয়েছে
অবাক ভোরের হিরণ রেখায়!
নতুন অব্দের দ্বাদশী এখন তার
স্বপ্নরা ফুটছে ফুল হয়ে
হৃদয় উড়ছে- পাখি আর প্রজাপতির ডানায়
ফুটছে, ফুটতে দাও
উড়ছে, উড়তে দাও
রাতের স্বভাব সুন্দরের কাছে তার
এখন আনন্দ আরাধনা…
তবে কেন সহস্রাব্দের অশুভ প্রেত
অবিকল ভয়ার্ত অতীত আঁধার জাগায় বারবার
ঘুম কেড়ে নিয়ে, কেড়ে নিতে চায় স্বপ্ননিদ্রা তার?
নতুন অব্দের দ্বাদশী এখন তার, শুধু তার!